বন্যার বিপর্যস্ত পরিস্থিতির মধ্যেই কুমিল্লাজুড়ে ডাকাত আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ত্রাণ বিতরণের নামে অনেক জায়গায় ডাকাতি করা হচ্ছে! উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজেদের সম্পদ রক্ষায় এলাকাবাসী রাতজেগে পাহারা দিচ্ছেন। মসজিদের মাইকে রাতের বেলায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এমন অবস্থায় প্রকৃত ত্রাণ বিতরণকারীরাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন। কোথাও কোথাও তাদের সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে। তবে পুলিশ বলছে, দুর্গম এলাকাগুলোতে অনেক ‘সুযোগসন্ধানী’ বন্যা পরিস্থিতির সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলে গিয়ে ডাকাতির সত্যতাও মিলছে না। যেসব জায়গায় ডাকাতি হচ্ছে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয়দের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলায় ডাকাত আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর প্লাবিত এলাকাগুলোতে ডাকাতদল হানা দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বুড়িচং উপজেলার জরইন, পূর্ণমতি, বাকশিমুল, ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সাহেবাবাদ, টাকই, জিরুইনসহ আশপাশের গ্রাম থেকে ডাকাত আতঙ্কের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার জিরুইন গ্রামের বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক আতিকুর রহমান বলেন, ‘গত তিন দিন ধরে আমরা রাতের বেলায় পাহারা দিচ্ছি। শুনছি আশপাশের এলাকায় ডাকাতি হচ্ছে। তাই বাড়তি সতর্কতা হিসেবেই এ কাজ করছি। রবিবার রাত ২টার দিকে খবর পাই, একদল লোক আমাদের এলাকার দিকে আসছেন। আমরা তখন জোট বেঁধে রাস্তায় নামি। তখন মসজিদের মাইকে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়। প্রতি রাতেই বিভিন্ন এলাকায় ডাকাত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এলাকাবাসী আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন। ত্রাণ দেওয়ার কথা বলে নাকি ডাকাতদল সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে।’
বুড়িচং উপজেলার বাকশিমুল গ্রামের গৃহবধূ শারমিন সুলতানা বলেন, ‘এক দিন আগে আমার চাচাশ্বশুরের বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। বন্যায় আমাদের বাড়িতে কোমরসমান পানি উঠলেও আমরা বাড়ি ছেড়ে যাইনি। এখন ভয়ে আছি, ডাকাতদল যদি হানা দেয়।’
ঢাকা থেকে কুমিল্লায় ত্রাণ বিতরণ ও উদ্ধার কাজে আসা স্বেচ্ছাসেবক শিহাব বলেন, ‘ডাকাত আতঙ্কের কারণে অনেক স্থানে আমাদের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। গত রাতে (সোমবার) আমাদের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শেষ করতে প্রায় ১১টা বেজে যায়। স্পিডবোটে করে দুর্গম এলাকা থেকে ফিরছিলাম। আলো না থাকায় আমাদের কিছুটা ভয় করছিল। এমন সময় সামনে একটা বোট দেখে আমরা ভয়ে থেমে যাই। তারাও আমাদের দেখে থেমে যায়। এভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর সাহস নিয়ে তাদের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় বুঝতে পারি তারাও আমাদের মতো স্বেচ্ছাসেবী। পরে জানলাম, তারাও আমাদেরকে ডাকাত ভেবে ভয় পেয়েছিল।’
এদিকে ডাকাত আতঙ্কের বিষয়টি নিয়ে গত সোমবার কুমিল্লায় বন্যার্ত এলাকা পরিদর্শনে আসা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এমন মহাবিপদের সময় যদি এ রকম ঘটনা ঘটে থাকে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। যেহেতু পুরো এলাকা বন্যাকবলিত। সব জায়গায় সহজে যাওয়া যায় না। পুলিশ জানলেও যেতে অনেক সময় লাগে, তাই পুলিশের পাশাপাশি জনগণকেও ঐক্যবদ্ধভাবে এগুলো প্রতিরোধ করতে হবে।’
একই কথা বলেছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে এ রকম খবর আমরা পাচ্ছি। পুরো এলাকা বন্যাকবলিত। আমি দুদিন আগে ত্রাণ বিতরণে গিয়ে দেখেছি, অনেক এলাকা খুবই দুর্গম। এসব এলাকায় দিনের আলোতেই যাওয়া যায় না। রাতের বেলায় যদি এসব জায়গায় ডাকাত আতঙ্ক শোনা যায়, তা হলে তো সেখানে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব না। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ আছেন যারা এগুলো করে থাকেন। অনেক মাদককারবারি আছেন যারা বন্যার কারণে মাদক বিক্রি করতে না পেরে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন। খবর পেলেই আমরা সেখানে পুলিশ পাঠাচ্ছি। তবে অধিকাংশ জায়গাতেই ডাকাতির সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে না। সেখানে গিয়ে জানা যাচ্ছে- ঘটনা আসলে ভিন্ন। তবে সবই যে মিথ্যা তা বলছি না। কিছু কিছু এলাকায় হয়তো ঘটছে। এত বড় এলাকা, কোথায় কী হচ্ছে তা সব সময় আমাদের নজরে আসা কঠিন। তাই পুলিশের পাশাপাশি জনগণকেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।