ভয়াবহ বন্যায় নোয়াখালীর ৮ উপজেলার ১৭ লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি। ১ হাজার ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় দুই লাখ বানভাসি মানুষ আশ্রিত। মঙ্গলবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. জাহিদ হাসান খান খবরের কাগজকে এ তথ্য জানান।
তিনি জানান, ৮ উপজেলার ৮৭ ইউনিয়নের ১৭ লাখ ৯ হাজার ৩০০ লোক এখনো পানিবন্দি। এ ছাড়া ১ হাজার ১৬ আশ্রয়কেন্দ্রে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৪১ মানুষ আশ্রিত। এসব কেন্দ্রে সরকারি ১২৪ ও বেসরকারি ১৬টি মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালন করছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বন্যায় এখন পর্যন্ত নোয়াখালীতে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ নগদ ৭৫ লাখ টাকা, ১ হাজার ৮০০ টন চাল, ১ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ১৫ লাখ টাকার শিশুখাদ্য ও ১৫ লাখ টাকার গো-খাদ্য বিতরণ করা হচ্ছে।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চারটি প্ল্যান্ট থেকে সব উপজেলায় বিশুদ্ধ পানিসহ ২০ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বেগমগঞ্জে সেনাবাহিনীর ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, জেলার কোথাও কোথাও পানি নামতে শুরু করেছে। তবে এখনো পানিবন্দি মানুষ কষ্টে রয়েছে। সরকারি ত্রাণ তহবিল থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।
ফেনীতে ৯২০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত
বন্যার কারণে গত ২০ আগস্ট থেকে ফেনী জেলার প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজসহ ৯২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা থাকলেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা। একবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আরেকবার ভয়বহ বন্যা মিলিয়ে সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা।
ফেনীতে প্রাথমিক বিদ্যালয় ৫৫৯টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৯৩টি, মাদ্রাসা ১২৮টি, কলেজ ৩০টি, কারিগরি, ডিপ্লোমা ও প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১০টি। এসব প্রতিষ্ঠান বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে বই-পুস্তক ও আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে যায়। নষ্ট হয় বিদ্যু সংযোগ, মোটর পাম্প, কম্পিউটারসহ নানা জিনিসপত্র। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে ১০-১২ দিন পানি থাকায় ফ্লোর, বারান্দা দেবে গিয়ে গর্ত হয়। অনেক দেয়ালে ফাটলেরও সৃষ্টি হয়। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেগুলো পাঠদানের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দ্রুত সময়ে সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন স্কুলপ্রধানরা।
ফেনী পৌরসভার সুলতানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চয়নিকা চৌধুরী বলেন, বন্যায় স্কুল ভবন পুরো ডুবে ছিল। স্কুলের মোটর পাম্পসহ বিদ্যুৎ সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শ্রেণিকক্ষগুলোও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে আছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
শহিদ মেজর সালাউদ্দিন মমতাজ বীর উত্তম উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অর্চনা রানী চক্রবর্তী বলেন, ‘দুর্যোগকালে আমাদের বিদ্যালয়টিকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বন্যার কারণে অনেক ফ্লোর দেবে গেছে, আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। পুরো স্কুলের আনুমানিক ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমরা এসব বিষয়ে শিক্ষা অফিসারকে জানিয়েছি। বাকি কক্ষগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে।’
এদিকে পানি নামলেও পাঠদানের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বলছেন, বন্যায় অনেক শিক্ষার্থীর বইপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এর আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে আন্দোলনের মাঠে ছিল শিক্ষার্থীরা। এরপর বন্যার বন্ধ।
কবির আহম্মদ নামে এক অভিভাবক জানান, একদিকে বন্যা, অন্যদিকে আন্দোলন। সব মিলিয়ে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া হচ্ছে না। এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে।
ফেনী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, বন্যার সময় জেলার ৫৫৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানির নিচে তলিয়ে যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো পাঠদানের অনুপযোগী হয়ে আছে। শহর এলাকার কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে পাঠদানের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। গ্রামীণ পর্যায়ে যেসব শিক্ষার্থীর বইপত্র নষ্ট হয়ে গেছে স্কুলগুলোকে তার তালিকা প্রনয়ণের জন্য বলা হয়েছে। তালিকা হাতে পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা হবে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফী উল্লাহ বলেন, বন্যার সময় জেলার ৩৬১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজ প্লাবিত হয়েছে। বন্যা ও মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো স্বাভাবিক রূপে আসেনি। এরপরও উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করার জন্য। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে সে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।