কুষ্টিয়ার মিরপুরে গায়েবি প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে সদ্য সাবেক ইউএনও নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে। কাগজে-কলমে ১৭টি প্রকল্পের কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। এর বিপরীতে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা উত্তোলনও করা হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব কাজের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রকল্প কমিটির সভাপতিরা কাজের ব্যাপারে কিছুই জানেন না। ঠিকাদারি কাজে সুবিধা পেতে ও ইউএনওকে খুশি করতে চেকে সই দিয়েছেন বলে দাবি তাদের।
জানা গেছে, মিরপুর উপজেলার উন্নয়ন তহবিল থেকে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ধুবাইল ইউনিয়নের গোবিন্দগুনিয়া গ্রামের কফিল উদ্দীনের বাড়ির সামনের একটি কালভার্টের অ্যাপ্রোচ নির্মাণের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাগজে-কলমে কাজ শেষ করে টাকা উত্তোলন করেছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি সোহেল রানা। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই স্থানে কোনো কালভার্টের অস্তিত্ব নেই। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদক তথ্য অনুসন্ধান করলে নড়েচড়ে বসেন উপজেলা প্রকৌশলী জহীর মেহেদী হাসান। তিনি কাগজে-কলমে কাজটি সঠিকভাবে করা হয়েছে দেখাতে গিয়ে বিষয়টি আরও জটিল করে ফেলেন। বিল ফাইলের কাগজে ওভার রাইটিং করে ধুবাইল ইউনিয়ন কেটে বাড়ুইপাড়া ইউনিয়নের নাম লেখেনভ। তবে ধুবাইল ইউনিয়নের গোবিন্দগুনিয়া গ্রামে যেভাবে কোনো কালভার্টের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, তেমনি সংশোধিত বাড়ুইপাড়া ইউনিয়নেও গোবিন্দগুনিয়া নামের কোনো গ্রাম খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, এই প্রকল্পের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি যাকে বানানো হয়েছে, সেই সোহেল রানা কাজটির বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন। তিনি জানান, সদ্য সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম লোক পাঠিয়ে একটি ২ লাখ টাকার চেকসহ কিছু কাগজে তার সই করিয়ে নিয়ে যান। এটি ছাড়া এই কাজে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ইউএনওকে খুশি করার জন্য তিনি তার কথার বাইরে যেতে পারেননি বলেও উল্লেখ করেন পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মিরপুর শাখার ব্যবস্থাপক এবং এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি সোহেল রানা।
ঠিক এভাবেই বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ না করে লাখ লাখ টাকা তছরুপের অভিযোগ উঠেছে মিরপুর উপজেলার সদ্য সাবেক ইউএনও নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ১৭টি প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা উত্তোলন হলেও কাজের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। অধিকাংশ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতিরাই জানেন না যে তিনি কোন প্রকল্পের সভাপতি, কিংবা প্রকল্পের টাকা কোথায় খরচ করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, নাজমুল ইসলাম মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকার সময় তিনি একাধারে মিরপুর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলার পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তিনি বনে যান ‘ক্ষমতার পাওয়া হাউস’। সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেই ঠিকাদারি করে এসব প্রকল্পের টাকা নয়ছয় করেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয় ঠিকাদার ও জনপ্রতিনিধিদের। এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউএনও নাজমুল ইসলাম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একই তহবিল থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবারহ প্রকল্প বাবদ ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই টাকার বিষয়ে জানেন না প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস। তিনি বলেন, ‘ইউএনও স্যার ডেকে কিছু কাগজ আর ২ লাখ টাকার চেক সই করিয়ে নেন। আমি স্যারের কথামতো সই করে দিয়ে আসি। আমরা বিভিন্ন সময় ছোটখাটো কাজ নিয়ে স্যারের কাছে যাই, স্যার আমাদের ওপর খুশি থাকলে সেই কাজগুলো সহজেই করে দেন।’ তাই ইউএনওকে খুশি করতে চেকে সই করে দেন, এর বেশি কিছু জানেন না তিনি।
অপরদিকে, এই প্রকল্পের টাকার কোনো চিকিৎসাসামগ্রী বুঝে পাননি বলে জানান মিরপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. পিজুস কুমার। তিনি জানান, কোনো একদিন ইউএনও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কিছু এক্স-রে ফ্লিম দিয়েছিলেন। যার দাম খুব বেশি হলেও ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা হতে পারে। তবে এটি কোন ফান্ড থেকে দেওয়া হয়েছে, সেটা তাকে বলা হয়নি। এ ছাড়া ২ লাখ টাকা বা এই পরিমাণে কোনো চিকিৎসাসামগ্রী সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত নন।
একইভাবে মিরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গাছের চারা রোপণ বাবদ ২ লাখ টাকা, চেয়ারম্যান ভবন মেরামত বাবদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকাসহ প্রায় ১৭টি প্রকল্প দেখিয়ে ৩৪ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতিদের দাবি, উপজেলা প্রকৌশলী জহীর মেহেদী হাসানের সহযোগিতায় সদ্য সাবেক ইউএনও নাজমুল ইসলাম এসব প্রকল্পের টাকা তুলে নেন।
অন্যদিকে মিরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গাছের চারা রোপণ বাবদ ২ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি সায়েম আলী। উপজেলা চেয়ারম্যানের ভবন মেরামত বাবদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন প্রকল্পের সভাপতি জামসেদ আলী।
তাদের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে একই জবাব পাওয়া যায়। সায়েম আলী নিজে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে ইউএনও নাজমুল ইসলামের কথামতো টাকা তার কাছে জমা দিয়ে আসেন। আর ইউএনও তার লোক পাঠিয়ে বিল ভাউচারসহ চেকের পাতায় সই করিয়ে নিয়ে যান বলে দাবি করেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি জামসেদ আলী।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ঠিকাদারদের অভিযোগ, একটি উপজেলার প্রধান সরকারি কর্মকর্তা হয়েও সদ্য সাবেক এই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাগজে-কলমে পছন্দের লোকের নাম ব্যবহার করে ‘নিজেই ঠিকাদারির’ কাজ করতেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সদ্য সাবেক মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কাজ করতে গেলে কিছু ভুল ত্রুটি হতে পারে। আমার ক্ষেত্রে হয়তো তেমনটা হয়ে থাকবে। তবে কাজ না করে টাকা উত্তোলনের মতো কোনো কাজ করিনি।’
উপজেলা প্রকৌশলী জহীর মেহেদী হাসানের দাবি, ‘কাজ করা হয়েছে বিধায় বিল উত্তোলনের জন্য টাকা ছাড় করা হয়।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (উপসচিব) আহাম্মেদ মাহাবুব উল ইসলাম বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী একটি প্রকল্প পাস হলে, সেই প্রকল্পের কাজ সম্পাদনে জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি হবে। সেই কমিটির বাইরে কারও কাজ করা বা অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নেই। যদি এসব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তা হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অবশ্যই বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’