১ ডিসেম্বর বেলা ১১টা। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার জয়ন্তীয়া ঘাটে কাঠের সাঁকোর পাশে একটি নৌকা বেঁধে রাখতে দেখা যায়। এই নৌকার এখন তেমন কাজ নেই। ঘাটের ইজারাদারের লোকজন মাছ ধরতে চাইলে নৌকাটি নিয়ে যান।
পাশে থাকা সাঁকোর ওপর দিয়ে কিছু মানুষকে তখন নদী পার হতে দেখা যায়। এ জন্য তাদের টোল দিতে হয়। হেঁটে গেলে গুনতে হয় ১০ টাকা। বর্ষায় সাঁকোটি ডুবে যায়। বেঁধে রাখা নৌকাটি তখন খানসামা ও বীরগঞ্জ উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। টোলের পরিমাণ তখন আরও বাড়ে।
এই সাঁকোটির পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় কয়েকটি পিলার। সেতু নির্মাণকাজে ব্যবহার হওয়া কিছু সামগ্রী, মালবাহী ট্রলি ও পাহারাদারের রুমও রয়েছে সেখানে। নির্মাণসামগ্রী দেখভালের দায়িত্বে থাকা দুজন পাহারাদার তখন অলস সময় পার করছিলেন। এমন চিত্র দীর্ঘদিনের। ছয় বছর আগে এখানে একটি সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হলেও তা আজও শেষ হয়নি। এতে দুপারের বাসিন্দারা গত অর্ধযুগ ধরে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জয়ন্তীয়া ঘাটে ৪৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র আহ্বান করার পর কাজ পায় ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সুরমা কনস্ট্রাকশন। চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সালের এপ্রিলে কাজ শেষ করার কথা। এরপর দুই মেয়াদে সময় বাড়িয়ে কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫৬ শতাংশ। বাকি কাজ রেখেই এক বছর আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেখান থেকে চলে যায়।
এলজিইডি দিনাজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় জানায়, ‘গ্রামীণ সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় বীরগঞ্জের পাল্টাপুর ইউনিয়নের মধুবনপুর ও খানসামার খামারপাড়া ইউনিয়নের চেহেলগাজী এলাকায় আত্রাই নদীর জয়ন্তীয়া ঘাটে সেতু নির্মাণের কাজ ২০১৮ সালে শুরু হয়। পরে করোনাকালে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ার অজুহাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ করে দেয়। দুই মেয়াদে সময় বৃদ্ধি করে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাত্র ৫৬ শতাংশ কাজ শেষ করে বাকি কাজ বন্ধ রাখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদার ও এলজিইডির গাফিলতির কারণে সেতুর কাজ শেষ হচ্ছে না। শুষ্ক মৌসুমে তাদের সাঁকো আর বর্ষায় নৌকা দিয়ে পারাপার হতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এই যাতায়াত করার সময় তাদের টোল দিতে হয়। প্রায়ই ঘটে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এ ছাড়া কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া করতে গিয়ে বেগ পেতে হয়।
কথা হয় মধুবনপুর এলাকার ভ্যানচালক আবু সামার সঙ্গে। বলেন, ‘সেতু না হওয়ায় এই পথে যাত্রীর সংখ্যা অনেক কম। জীবিকার তাগিদে যাত্রীর জন্য দীর্ঘসময় অপেক্ষায় থাকতে হয়। এখানে সেতু হলে আমার আয় বাড়বে।’
সেতু নির্মাণের সময় আশার আলো দেখলেও এখন সবই ম্লান হয়েছে জানিয়ে ওই এলাকার বাসিন্দা মোকসেদ আলী বলেন, ‘এই সেতুকে ঘিরে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। ভেবেছিলাম এলাবাসীর উপকার হবে। কিন্তু ছয় বছরেও সেতু হলো না। উল্টো কাজ শেষ না করেই ঠিকাদার পালিয়ে গেলেন। আমাদের ভোগান্তির দিকে কারও কোনো নজর নেই।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে কাঁচামাল ব্যবসায়ী সুরুজ মিয়া বলেন, ‘সেতুর অভাবে এই অঞ্চলের কৃষকদের কৃষিপণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ হয়। এতে পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। সেতুর কাজ শেষ হলে কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে। তাই দ্রুত সময়ে সেতুর কাজ করতে সংশ্লিষ্টদের সুদৃষ্টি প্রয়োজন।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালামালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পাহারাদার আব্দুল বাকী বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে পাহারার জন্য চুক্তিতে দায়িত্বে আছি। শুরু থেকেই কাজের ধীরগতি ছিল। গত এক বছর ধরে কাজ পুরোপুরি বন্ধ।’ তিনি বলেন, গত ছয় মাস ধরে বেতন পাচ্ছি না। ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বেতনের টাকা পাইনি। তারপরও বকেয়া বেতনের আশায় আমরা দুজন পাহারা দিয়ে যাচ্ছি।
খানসামা উপজেলার খামারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক চৌধুরী বলেন, এই সেতুর অভাবে দুই অঞ্চলের মানুষকে অন্তত ১০ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে যেতে হয়। এতে কৃষিপণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ, রোগী ও জরুরি প্রয়োজনে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। তাই দ্রুত সময়ে সেতুর কাজ শেষ করে জনসাধারণের চলাচলের জন্য সেতু উন্মুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
এদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুরমা এন্টারপ্রাইজের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
দিনাজপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান বলেন, ‘সেতুর কাজ শেষ করতে এর আগেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কয়েকবার চিঠির মাধ্যমে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবু কাজের অগ্রগতি হতাশাজনক। সুরমা এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে।