বরিশালের বাকেরগঞ্জের গারুরিয়া গ্রামের গাজী বজলুর রহমান জেলা পরিষদে উচ্চমান সহকারী পদে চাকরি করেন। থাকেন বরিশাল শহরে। বাবা মারা গেলেও গ্রামের বাড়ির সম্পত্তি এখনো ভাগাভাগি হয়নি। স্থানীয়ভাবে গাজীবাড়ি হিসেবে পরিচিত ওই বাড়িতে একটি পুকুর রয়েছে। পুকুরের একপাশে একটি ঘাটলা অন্যপাশে ছোট আকারের পাঞ্জেগানা (নামাজ পড়ার জায়গা) রয়েছে। সেখান থেকে ঘাটলার দূরত্ব সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট। এই পাঞ্জেগানায় গাজীবাড়ির লোকজন নামাজ পড়েন। গ্রামের অন্য কেউ এখানে নামাজ পড়তে আসেন না, কখনো পুকুরের ঘাটলাও ব্যবহার করেন না।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ওই পুকুরটিকে মসজিদের মুসল্লিরা ব্যবহার করেন দেখিয়ে সেখানে একটি ঘাটলা নির্মাণ বাবদ তিন লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সেখানে নতুন করে কোনো ঘাটলাও নির্মাণ করা হয়নি। পুরোনো জরাজীর্ণ ঘাটলাকে নতুন দেখিয়ে প্রকল্পের পুরো অর্থ গত জুলাই মাসে উত্তোলন করা হয়েছে। তবে এ নিয়ে খবরের কাগজের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান শুরু হলে গতকাল শনিবার সকালের পুকুরঘাটে রড সিমেন্ট এনে ঘাটলা নির্মাণকাজ শুরু করেন গাজী বজলুর রহমান ও তার পরিবার।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেলা পরিষদের অর্থায়নে বাকেরগঞ্জ উপজেলার গারুরিয়া ইউনিয়নের ‘গাজীবাড়ি মসজিদসংলগ্ন পুকুরের ঘাটলা নির্মাণ’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় তিন লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে গাজীবাড়ির সন্তান নুরুল ইসলাম গাজীকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি করে কাগজাদি জেলা পরিষদে জমা দেওয়া হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম কিস্তি এবং জুলাই মাসের দ্বিতীয় দফায় চূড়ান্ত কিস্তির চেকের মাধ্যমে তিন লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পরিষদের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পারিবারিক ওই পুকুরের পুরোনো একটি ভাঙাচোরা ঘাটলাকে নতুন দেখিয়ে দুই কিস্তিতে প্রকল্পের পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে নুরুল ইসলাম গাজীর নাম থাকলেও তার ভাই উচ্চমান সহকারী গাজী বজলুর রহমান রেজিস্ট্রার খাতায় স্বাক্ষর করে চেক দুটি তুলে নেন।’
ওই এলাকার বাসিন্দারা জানান, পাঞ্জেগানায় মূলত গাজীবাড়ির লোকজন ওয়াক্তের নামাজ পড়েন। এখানে কোনো জামাতে নামাজ হয় না। আজানও হয় না। এমনকি ইমাম ও মুয়াজ্জিনও রাখা হয়নি। মসজিদ পরিচালনা কমিটিও নেই। মসজিদের বিপরীতে গাজীবাড়ির পুকুরটি বজলুর রহমানের পারিবারিক কাজে ব্যবহার করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাজীবাড়ির একাধিক ব্যক্তি বলেন, বজলুর রহমান নিজস্ব ক্ষমতাবলে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের পুকুরের ঘাটলা নির্মাণের জন্য মসজিদের নাম করে জেলা পরিষদ থেকে অর্থ বরাদ্দ করিয়েছেন। কিন্তু এই পুকুরে কোনো ঘাটলা নির্মাণ করা হয়নি। গাজীবাড়ির সামনের পাঞ্জেগানায় মুসল্লিরা আসেন না। তারা প্রধান সড়কের পাশে থাকা দুটি জামে মসজিদের নামাজ আদায় করেন।
বজলুল রহমানের বড় ভাইয়ের স্ত্রী মরিয়াম আক্তার বলেন, ‘এই ঘাটটি আমার দাদাশ্বশুরের আমলে নির্মাণ করা হয়েছে। এটি ভেঙে নতুন ঘাটলা নির্মাণের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু পুকুরে অতিরিক্ত পানি ও ঝড়-বন্যা কারণে ঘাটলা নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।’
এদিকে চেক তোলার বিষয়ে জেলা পরিষদের উচ্চমান সহকারী গাজী বজলুর রহমান বলেন, ‘পুকুরটি আমাদের পারিবারিক হলেও সেটি বাড়ির সকলেই ব্যবহার করেন। এখানে আমার কোনো দায় নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি কমিটি রয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল থেকে জেলা পরিষদের বরাদ্দের অর্থ দিয়ে ঘাটলা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বরিশালের সভাপতি অধ্যক্ষ (অব.) গাজী জাহিদ হোসেন বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ না করেই ছয় মাস আগে চূড়ান্ত বিল কীভাবে দিল জেলা পরিষদ। এটা আমার বোধগম্য নয়। এখন চাপে পড়ে নির্মাণকাজ শুরু করেছে ঠিক আছে। কিন্তু ঘাটলা নির্মাণ না করে অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে তো বড় ধরনের দুর্নীতি করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রশাসক অথবা চেয়ারম্যানও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। এর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। না হলে এ ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।’
এ বিষয়ে জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতী বেগম খবরের কাজকে বলেন, পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার্য কোনো পুকুরে ঘটলা নির্মাণ কিংবা সংস্কারের জন্য প্রকল্প গ্রহণের কোনো নিয়ম নেই। তবে জনসাধারণের ব্যবহার্য কোনো পুকুরের ক্ষেত্রে আমরা প্রকল্প নিতে পারি। প্রকল্পের নির্মাণকাজ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত অর্থ করার প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি জানান, নিয়ম অনুযায়ী ছোট বড় যেকোনো প্রকল্পের কাজ সমাপ্তির পর তার চারদিকের ছবি নামফলক স্থাপনযুক্ত ছবি জমা দিতে হয়। এ জন্য একটি কমিটি রয়েছে, তাদের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করেই অর্থ ছাড় করা হয়। ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।