নোয়াখালীর একমাত্র পর্যটন দ্বীপ এলাকা নিঝুম দ্বীপ। সাম্প্রতিক সময়ে জেলার ওপর দিয়ে যতগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ গেছে তার সবগুলোর প্রভাব পড়েছিল হাতিয়া উপজেলার এই ইউনিয়নে। ভেঙে ছিল একাধিক সড়ক ও কালভার্ট।
সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে ওই সড়ক ও কালভার্টগুলো মেরামত করেন। কিন্তু দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব রাস্তা-কালভার্টগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এতে গত দুই বছর ধরে ওই এলাকার মানুষের পাশাপাশি ঘুরতে যাওয়া পর্যটকরা ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিঝুম দ্বীপের তিনটি কালভার্ট ধসে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে পর্যটকদের আগমন কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে পর্যটন সম্ভাবনার তালিকা থেকে নিঝুম দ্বীপের নাম মুছে যাবে। এ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়বেন। এরই মধ্যে এ খাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভাটা পড়েছে। স্থানীয়রা চান, দ্রুত সময়ের মধ্যে এগুলো সংস্কার করা হোক। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এগুলোর কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বুধবার(১১ ডিসেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিঝুম দ্বীপের বন্দরটিলা ঘাট থেকে নামার বাজার পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার পাকা রাস্তায় অনেক ব্রিজ-কালভার্ট রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যত প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে সেগুলোর সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের প্রবল জোয়ার গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটির ওপর দিয়ে গড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো কাজ না হওয়ায় সড়কটিতে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। পুরো সড়কটির বেশির ভাগ এলাকা ধসে এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
মোটরসাইকেল আরোহী মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের অস্বাভাবিক জোয়ারে ছোঁয়াখালি লাইট হাউসসংলগ্ন ব্রিজটি ধসে পড়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। এ কারণে মানুষের পারাপারে দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। সড়কের মাঝামাঝি জায়গায় ভেঙে যাওয়ায় মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের দেওয়া চাঁদা ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সহযোগিতায় সংরক্ষিত বনের গাছ দিয়ে যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, জায়গাটি তত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।’
জানা গেছে, ইউনিয়নের সিরাজ চেয়ারম্যানের বাসাসংলগ্ন মূল সড়কের ব্রিজটিও ভেঙে গিয়েছিল। সেখানে একটি বিকল্প মাটির রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেটিও হুমকির মধ্যে রয়েছে। এ জায়গায় মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা পার করতে চালকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। মালামাল পরিবহনে টমটমগুলো (তিন চাকার অবৈধযান) এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে পারছে না। ফলে ব্যবসায়ীদের মালামালগুলো মাথায় করে ভাঙা রাস্তা পার করতে হচ্ছে। এতে পণ্য আনা-নেওয়া করতে খরচ বাড়ছে।
ওই এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ী মো. ইলিয়াস বলেন, ‘ইউনিয়নের কামাল মেম্বারের বাড়ির পাশে একটি পোল আছে। জোয়ারের তোড়ে ওই রাস্তাটি ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভুক্তভোগীরা নিজ উদ্যোগে বিকল্প রাস্তা তৈরি করলেও যান চলাচলের ঝুঁকি বেড়েছে। প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। বন্দরটিলা থেকে নামারবাজারে মাছ, বরফ ও মালামাল পরিবহনে ভীষণ কষ্ট পেতে হয়। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’
স্থানীয় ফার্মেসির পল্লি চিকিৎসক মো. বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘বছরের পর বছর রাস্তাটির সংস্কার না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। গর্ভবতী মায়ের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে আমাদের চলাচল করতে হয়। সংস্কারবিহীন সড়কটি এ অঞ্চলের স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, হাট-বাজারে যাতায়াত করা শত শত মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
সোহেল রিসোর্টের মালিক মো. ইব্রাহীম জানান, যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় নিঝুম দ্বীপে ভ্রমণপিপাসুদের সংখ্যা কমে গেছে। পুরো রাস্তায় গর্ত থাকায় গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা নেই। স্থানীয়রাও সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে পর্যটনশিল্পে বিপর্যয় নেমে আসবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মোক্তারিয়ার ঘাট থেকে জাহাজমারা পর্যন্ত সড়ক এবং নিঝুম দ্বীপের ১০ কিলোমিটার রাস্তা দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কার না করলে পর্যটন সম্ভাবনাময় তালিকা থেকে নিঝুম দ্বীপের নাম মুছে যাবে। জনদুর্ভোগ কমাতে হলেও শিগগিরই পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান লাভলী বেগম বলেন, ‘নিঝুম দ্বীপের রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পরিষদে কোনো তহবিল নেই। দীর্ঘদিন ধরে হাতিয়ায় কোনো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা না থাকায় রাস্তা মেরামতের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি।’
হাতিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, ‘নিঝুম দ্বীপে ৪৫ মিটারের একটি ব্রিজ ও দুটি কালভার্ট ধসে রাস্তা বিচ্ছিন্ন হলেও সাময়িকভাবে বিকল্প রাস্তা করে মোটামুটি সংযোগ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সেখানে রাস্তার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’ একই কথা বলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সম্প্রতি যোগ দেওয়া ইবনে আল জায়েদ হোসেন।