চলতি বছরের জুনে হবিগঞ্জের সদর উপজেলার জালালাবাদ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। এতে বিলীন হয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকার বিভিন্ন শস্য, মাছের ঘের ও ঘরবাড়ি। পরে আগস্টে বন্যায় সেই ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এতে প্রায় ২০০ ফুট প্রশস্ত হয়ে যায়। বর্তমানে ভাঙনকবলিত জায়গাটি বিশাল খাদে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, বাঁধের সড়ক দিয়ে জেলার সদর উপজেলার লোকড়া, রিচি এবং লাখাই উপজেলার করাব ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের মানুষ চলাচল করেন। এমনকি পাশের জেলা কিশোরগঞ্জের মানুষও এদিকে আসা-যাওয়া করেন। সদর উপজেলার কাশিপুর, চানপুর, গোপালপুর, মথুরানগর, জয়নগর, ইসলামপুর, যাদবপুরসহ অনেক গ্রামের মানুষের শহরে আসার একমাত্র রাস্তা এটি। কিন্তু বর্তমানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে ভাঙনকবলিত জায়গা পর্যন্ত গিয়ে বাকি পথ নৌকায় যেতে হচ্ছে। এতে বন্ধ রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন। দীর্ঘ সাত মাসেও মেরামত করা হয়নি ভাঙনকবলিত জায়গাটি। এ কারণে সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এদিকে চলতি বোরো মৌসুমে ঝুঁকিতে পড়তে পারে বিস্তীর্ণ হাওরের কয়েক শ একর ফসলি জমি। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। তাদের দাবি, বাঁধটি দ্রুত মেরামত করা না হলে নদীতে পানি এলেই তলিয়ে যাবে বিস্তীর্ণ হাওরের কয়েক শ একর বোরো ফসল। এ ছাড়া বন্যায় ঝুঁকিতে আছে জেলা শহরের নিম্নাঞ্চলসহ অনেক গ্রাম। ভাঙা জায়গাটি মেরামতের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে জানান স্থানীয়রা। এ নিয়ে গ্রামবাসীর কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে।
জালালাবাদ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রতিদিনের কাজে শহরে যেতে পারি না। আগে সহজেই সাইকেল, অটোরিকশা বা হেঁটে যেতাম। এরপর আমরা নৌকায় পার হতাম। তবে শীতে পানি কমে গেলে পারাপারে অনেক কষ্ট হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাত মাস ধরে অনেক কষ্টে চলাচল করছি। কিন্তু জায়গাটি মেরামত করা হচ্ছে না। আমি সরকারকে অনুরোধ করব, দ্রুত যেন বাঁধের জায়গাটি মেরামত করা হয়।’
স্থানীয় কৃষক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘হাওরের জমিতে এবার বোরোর চাষ হবে কি না, সেটা নিশ্চিত না। আমরা ফসলের আবাদ করার সাহস পাচ্ছি না। কারণ বাঁধ যদি মেরামত করা না হয়, তাহলে নদীর স্রোতে হাওরের ফসল ডুবে যাবে। তাই ফসল বাঁচাতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’
জাহাঙ্গীর মিয়া নামে আরেক কৃষক বলেন, ‘আমাদের জীবিকা নির্ভর করে হাওয়ের জমির ওপর। যদি বাঁধ মেরামত না হয়, তাহলে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাব। ফসলের ক্ষতি মানে আমাদের সারা বছরের ক্ষতি। হাজার হাজার কৃষক বাঁধের দিকে থাকিয়ে আছেন, কখন মেরামত করা হবে।’
সদর উপজেলার লুকড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কায়সার রহমান বলেন, ‘আমাদের হাওরে জেলার সবচেয়ে বেশি বোরো ফসলের আবাদ হয়। কিন্তু জালালাবাদে খোয়াই নদীর বাঁধ সাত মাসেও মেরামত করা হয়নি। এখন বোরো মৌসুম। শত শত মণ ধান ঝুঁকিতে রয়েছে। এখনো বাঁধ মেরামত শুরু হয়নি। কবে কাজ শুরু হবে, কবে শেষ হবে কেউ বলতে পারে না। দেখা যাবে, চৈত্রের প্রথমেই নদীতে পানি এলে পুরো হাওর তলিয়ে যাবে। আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অনুরোধ করছি, যেন দ্রুত এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়।’
সদর উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী সামিউল আজম বলেন, ‘বাঁধ মেরামতের জন্য গত সেপ্টেম্বরে আমরা সার্কেল অফিসে ‘ডিজাইন ডেটা’ পাঠিয়েছি। বাঁধের ওই অংশটি মেরামতে ব্যয় হবে প্রায় অর্ধকোটি টাকা। তবে এখনো বরাদ্দ পাইনি। বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু হবে। তবে আশা করছি, শিগগিরই মেরামতের কাজ শুরু করতে পারব।’