বনের ভেতরে হরিণ-বানরের ছোটাছুটি। নদী বা খালের পাড়ে বিশাল কুমির ও গুইসাপসহ নানা রকমের পাখি আর অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর সুন্দরবন। ভাগ্য ভালো হলে এখানে দেখা মিলতে পারে বিশ্বখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের। বন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এবার শীতের শুরু থেকেই কোলাহলমুক্ত নির্মল পরিবেশ উপভোগ করতে সুন্দরবনে আসছেন। ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় বাড়ছে পর্যটন স্পটগুলোতে। এতে পর্যটন সংশ্লিষ্ট খাতগুলো চাঙা হতে শুরু করেছে।
জানা গেছে, বনবিভাগের উদ্যোগে সুন্দরবনের করমজল, হারবাড়িয়া, আন্ধারমানিক, কটকা, কচিখালী, আলিবান্দা, দুবলা, নীলকমল, শেখেরটেক, কলাগাছিয়া, দোবেকী ও কালাবগীতে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে বন্যপ্রাণীর পদচারণা, বনের নির্জনতা উপভোগ করতে ফুট ট্রেইল, ওয়াচ টাওয়ার, ঝুলন্ত ব্রিজ ও তথ্য কেন্দ্র রয়েছে। করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রটি খুলনা থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে লোকালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে পর্যটকের সংখ্যা বেশি। দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসার সুযোগ থাকায় এখানে ভিড় করেন পর্যটকরা।
খুলনার নেভি অ্যাংকরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী রাইকা রহমান জানান, বনে হরিণ, বানর, শূকরসহ পশুপাখির সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। মাঝে মধ্যে বাঘের দেখা মিলছে। বনে ঢুকলে আন্ধারমানিক, কটকা, কচিখালী, জামতলা সি-বিচের কাছাকাছি প্রচুর হরিণ দেখা যায়। গাছের পাতা ছিঁড়ে দিলে একেবারে কাছে চলে আসে হরিণ বা বানরের দল। কটকা থেকে জামতলা বিচে যাওয়ার পথে বনের খোলা পরিবেশে দলবেঁধে হরিণের ছুটে চলা দেখলে অন্যরকম শিহরন তৈরি হয়। করমজল পয়েন্টে নৌকা নিয়ে খালের ভেতরে ঢুকলে দেখা মেলে ডাঙ্গায় বসে রোদ পোহানো বিশাল কুমির। এখানে গাছে গাছে প্রচুর পাখি দেখা যায়। কটকা, দুবলারচরসহ বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় বন বিভাগের কর্মচারীদের।
সুন্দরবনে তিন দিনের ভ্রমণে আসা পটুয়াখালীর দুমকি এলাকার স্কুলশিক্ষক এসএম সিরাজুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের পদচারণায় সুন্দরবন এখন মুখরিত। ফুট ট্রেইল দিয়ে হেঁটে বনের অনেকটা ভেতরের অপার সৌন্দর্য উপভোগের ব্যবস্থা, আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র, সুউচ্চ ওয়াট টাওয়ার, পর্যটকদের জাহাজে নিরাপত্তার সঙ্গে রাত যাপন ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য মানুষকে সুন্দরবনে আকৃষ্ট করে।
বন সংরক্ষক দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ১১ হাজার ৫৭ জন পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে বিদেশি পর্যটক ছিলেন দুই হাজার ৬২২ জন। রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ কোটি ৬১ লাখ ৫ হাজার ৩৮৫ টাকা। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ লাখ ১৬ হাজার ১৪৩ জন পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। রাজস্ব আয় হয় ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৩২ হাজার ৪৮০ টাকা। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেও আশানুরূপ পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন।
সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তারা জেড এম হাছানুর রহমান জানান, দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের পদচারণায় সুন্দরবন যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। শীতকালে বনের নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা আসছেন।
এদিকে সুন্দরবনে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধিতে খুশি পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, বিগত কয়েক বছরে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনসহ নানা কারণে পর্যটক কমে যায়। এবার সে পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ায় সুন্দরবনে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে। এতে পর্যটন সংশ্লিষ্ট খাতগুলো চাঙা হতে শুরু করেছে।