গত বছর ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের তালিকায় থাকা বিপুলসংখ্যক মৃত ব্যক্তির নামে ব্যালট পেপার ইস্যু করে ভোট দেওয়া হয়েছে। বগুড়া জেলা নির্বাচন অফিস আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তালিকা হালনাগাদ করতে গিয়ে এ তথ্য পেয়েছে।
জেলা নির্বাচন অফিসার মো. ফজলুল করিম জানান, গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বগুড়ার ১২টি উপজেলা থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে, সেখানে ভোটার তালিকায় মৃত ব্যক্তির সংখ্যা ৩০ হাজার ১৫৩ জন। ওই তালিকায় সবচেয়ে বেশি মৃত ব্যক্তির নাম রয়েছে বগুড়া-৬ (সদর) আসনে, ৪ হাজার ৯৭৫ জন। আর সবচেয়ে কম রয়েছে বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনে, ৩ হাজার ৫৩৮ জন।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ১ হাজার ১৯৩ জন তথ্য সংগ্রহকারী বাড়ি বাড়ি গিয়ে যে তথ্য পেয়েছেন তাতে দেখা গেছে, বহু বছর ধরে দেশেই নেই এমন ব্যক্তিও ভোট দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, নিজ এলাকায় ভোটের দিন আসেননি তাদের ভোটও পড়েছে। বগুড়ার সাতটি আসনের যেসব কেন্দ্রে একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট নেওয়া হয়েছে, সেসব কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কেন্দ্র ও এলাকাভেদে জাল ভোট পড়েছে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত; কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি।
জেলা নির্বাচন অফিসার মো. ফজলুল করিম বলেন, ‘এবার ভোটার তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কমিশন খুবই সতর্ক এবং কোনোভাবেই যেন মৃত ব্যক্তির নাম তালিকায় না থাকে তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহকারীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব মৃত ব্যক্তির নাম তালিকায় আছে, সেসব নাম বাদ দেওয়া হবে।’ তিনি জানান, ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত আসা তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে ফরম পূরণ করেছেন ৭৩ হাজার ৮৮২ জন।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বগুড়ার কোনো কেন্দ্রেই শতভাগ উপস্থিতি না থাকলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে সারিয়াকান্দি উপজেলার বাঁশহাট, সোনাতলা উপজেলার শ্যামপুর, ধুনট উপজেলায় অন্তর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়, শিবগঞ্জ উপজেলার গণেশপুর ও শেলপুর উপজেলার ইসলামপুর কেন্দ্রসহ অনেক কেন্দ্রেই ভোট পড়েছিল শতভাগ। আর কেন্দ্রগুলোতে মৃত ব্যক্তির পাশাপাশি বিদেশে থাকা অনেক ভোটারের নামে ইস্যু করা ব্যালটে ভোট দেওয়া হয়েছে।
প্রায় ৭৫ বছর বয়সে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে মারা যান সাহেব আলী। তার ভোটকেন্দ্র বাড়ির পাশে বাঁশহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি সব ভোটই দিয়েছেন ওই কেন্দ্রে। কিন্তু তার মৃত্যুর এক বছর পর অনষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার নামে ব্যালট ইস্যু করে ভোট দিয়েছেন অন্য কেউ, এমন দাবি তার পরিবারের সদস্যদের।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ভোটে বাঁশহাটা কেন্দ্রে ভোট পড়ে শতভাগ। ওই কেন্দ্রের আরেক ভোটার ইউনুস আলী মণ্ডল।
তিনি বলেন, ‘গত বছর ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররা ভোট দেওয়ায় সুযোগ পাননি। ভোটের দিন কিছু ভোটার কেন্দ্রের কাছে এলে ম্যাজিস্ট্রেট ও গুলি করে হত্যার ভয় দেখিয়ে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তার পর কিছু মানুষ কেন্দ্রে ঢুকে সব ব্যালটে সিল দিয়ে পালিয়ে যায়।’
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাঁশহাটা কেন্দ্রে ভোট পড়ে ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ। এ কেন্দ্রের ভোটার প্রবাসী শাহিনুর আলম। তিনি মালয়েশিয়া গিয়েছেন গত ২০১৪ সালে। ৪ মাসের ছুটিতে ১০ বছর পর বাড়ি ফিরেছেন ২০২৪ সালের শেষে। তিনিও অভিযোগ করেন, এই কেন্দ্রে তার ভোট দিয়েছেন অন্য কেউ। ওই গ্রামে বেশ কিছু মানুষ কাজ করেন মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। কিন্তু তাদের ভোট দেওয়া হয় প্রতিটি নির্বাচনেই।