এমপি আসলে আগে পায়ে একটা মেরে দিব, এরপর এমপি থেকে বলতে হবে, তিনি এখানে কেন আসছেন? এখানকার এমপি হচ্ছেন আরমান সাহেব। এখানে এমপি কী জন্য আসবেন? এ কথা বলে ফোনের একপ্রান্ত থেকে মন্তব্য করেন, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা যুবদল কর্মী তারিকুল হক।
অপরপ্রান্ত থেকে জবাবে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) মো. আরমান উদ্দিন বলেন, এমপিকে তো লোহাগাড়ায় না আসতে বলি, তারপরেও লোকজনের জ্বালায় আসে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাতে এ সংক্রান্ত একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভাইরাল হওয়া পুরো অডিওটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, লোহাগাড়া উপজেলার পানত্রিশা, পুরানো বিওসি রাজঘাটা ও পুটিবিলা এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে তাদের দু'জনের মধ্যে এসব কথোপকথন হয়েছে।
এদিকে, যুবদল কর্মী তারিকুল হক দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। অপরদিকে, এমপির পিএ মো. আরমান উদ্দিনের সঙ্গেও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের গোপন সখ্যতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
জানা গেছে, সম্প্রতি স্থানীয় জনসাধারণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী চুনতি ইউনিয়নের পানত্রিশা এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় জড়িতরা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়েন। পরে পুলিশ সেখানে থাকা বেশ কয়েকটি শ্যালো মেশিন বিকল করে দেন। পরবর্তীতে তিনি বিষয়টি লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দকে অবগত করেন। এর পরপরই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন অভিযান চালিয়ে বালুগুলো জব্দ করেন।
আরও জানা গেছে, উপজেলার পুরোনো বিওসি রাজঘাটা এলাকার টংকাবতী খালের পাড় কেটে দেদারসে বালু বিক্রি করা হয়েছে। সেখানে স্থানীয় মো. হোসেন নামে এক ব্যক্তি বাধা দিলে তাকেও মারধরের চেষ্টা করা হয়।
প্রশাসনের তৎপরতায় বর্তমানে সেখান থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। মূলত তারিকুলসহ আরও বেশ কয়েকজন ব্যক্তি রাতের আঁধারে এক্সক্যাভেটরের সাহায্যে বালুগুলো লুট করে অন্যত্র বিক্রি করে দেন।
জানা গেছে, বিগত কয়েক মাস আগে পুটিবিলা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবালের নেতৃত্বে সরই খাল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়। পরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী অভিযান চালিয়ে শ্যালো মেশিন বিকলের পাশাপাশি ডাম্প ট্রাক জব্দ করে সংশ্লিষ্ট আইনে প্যানেল চেয়ারম্যান ইকবালসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে উপজেলা প্রশাসন বালুগুলো জব্দ করেন এবং নিলামের মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করেন।
স্থানীয় একটি সূত্র খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, লোহাগাড়া উপজেলার বিভিন্ন ছড়া ও খাল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির সঙ্গে বেশ কয়েকটি বালুখেকো সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে। তারমধ্যে তারিকুল, হিরু, আদিল, আরমান, ইকবাল, নাজিম, আরিফ, হোসেন এবং তৌহিদসহ আরও একাধিক ব্যক্তি এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য। তাদের মধ্যে কেউ সরাসরি বালু উত্তোলন, কেউ বিক্রি আবার কেউ এক্ষেত্রে তদবির বাণিজ্য করে থাকেন।
এ বিষয়ে জানতে যুবদল কর্মী তারিকুল হকের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার ব্যবহৃত নম্বরটি বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে এমপির পিএ মো. আরমান উদ্দিনের ফোনে যোগাযোগ করা হলে সংযোগ পাওয়া যায়নি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, স্থানীয় জনসাধারণ ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে পানত্রিশা নামক জায়গায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি শ্যালো মেশিন বিকল করা হয়েছে। পরবর্তীতে ইউএনও'কে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসন বালুগুলো জব্দ করেন। এ ছাড়াও বিগত কয়েকমাস আগে পুটিবিলা সরই খাল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলাও করা হয়।
এদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দ কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চুনতি ইউনিয়নের পানত্রিশা এলাকায় অবৈধভাবে উত্তোলনকৃত বালুগুলো জব্দের বিষয়টি খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে এক ব্যক্তি রিসিভ করে তিনি (শাহজাহান চৌধুরী এমপি) ব্যস্ত আছেন বলে জানান।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের (২৫ ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম নগরীর ইস্পাহানি মোড়ের একটি রেস্টুরেন্টে মো. আরমান উদ্দিনের বিরুদ্ধে চাঁদা আদায় ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হাজত খাটানোর অভিযোগ তুলে খোরশেদ আলম নামে এক ব্যবসায়ী সংবাদ সম্মেলন করেন। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় বর্তমান সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর পাশে আরমানকে তেমন একটা দেখা যায়নি। বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় থেকে আরমান পুনরায় শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন।
আরিফুল ইসলাম/নাঈম