বরিশাল-বানারীপাড়া আঞ্চলিক সড়কের গুঠিয়া ব্রিজ। জেলা সদর থেকে এই জায়গাটির দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। পড়েছে উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নে। ব্রিজের পশ্চিম পাশের সড়কে গেলে দেখা মিলবে কয়েকটি মিষ্টির দোকানের। এই দোকানগুলোতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি করা একটি সন্দেশ পাওয়া যায়। এলাকার নামানুসারে এটিকে সবাই ‘গুঠিয়া সন্দেশ’ নামে চেনে।
অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে একই পদ্ধতিতে তৈরি করা মুখরোচক এই মিষ্টান্নটির সুনাম দেশের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এখানে এসে সন্দেশটির স্বাদ নেন। কেউ আবার বন্ধু-স্বজনদের জন্য নিয়ে যান। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর খাটি দুধের সংকটের কারণে কারিগররা এই মিষ্টান্নের স্বাদ ধরে রাখতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। এরপরও কয়েকজন কারিগর এখনো সেই পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সতীশ চন্দ্র দাস নামে গুঠিয়া এলাকার একজন ময়রা ১৯৬০ সালের দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া থেকে সন্দেশ তৈরির কৌশল শিখে আসেন। এরপর তার ঘনিষ্ঠ বাদশা হাওলাদারকে সঙ্গে নিয়ে এ সন্দেশ তৈরি করেন। কয়েক দশক আগে সতীশ চন্দ্র কলকাতায় চলে যান। পরে সেখানেই তিনি মারা যান। তবে তার বিখ্যাত সন্দেশের ঐতিহ্য ধরে রাখেন বাদশা হাওলাদারের ছেলে শাওন হাওলাদার, সতীশ চন্দ্রের ভাইয়ের ছেলে পরিমল চন্দ্রসহ কয়েকজন। তারা একই পদ্ধতিতে সন্দেশ তৈরি করে বিক্রি করছেন।
উজিরপুর উপজেলার ঢহরপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মিজানুর রহমানের মতে, ‘এই সন্দেশের জন্যই গুঠিয়া ইউনিয়ন আজ খ্যাতি লাভ করেছে। ঐতিহ্যবাহী মুখরোচক খাবার হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে এসে অনেকে এই সন্দেশ নিয়ে যান। এর স্বাদ ও মান বজায় থাকায় দেশ বিদেশের পর্যটকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।’
সন্দেশ তৈরির প্রণালি নিয়ে কারিগরা জানান, সাধারণত ছয়-সাত কেজি দুধ থেকে এক কেজি ছানা উৎপাদন হয়। সেই ছানার সঙ্গে পরিমাণ মতো চিনি ও ময়দা অল্প আঁচে পাকিয়ে ৫ মিনিট রাখলেই কাঁচামাল তৈরি হয়। পরিমাণমতো আঁচ ও পাকই হলো সন্দেশ তৈরির মূল কাজ। তবে ছানা বেশি সময় রেখে দিলে ভালো সন্দেশ হয় না। পাকের পর ছোট গোল্লা করে চ্যাপ্টা করে সন্দেশ তৈরি করা হয়। সন্দেশের সৌন্দর্য বাড়াতে মাঝখানে একটি পরিষ্কার কিশমিশ দানা বসিয়ে দেওয়া হয়।
সতীশ চন্দ্রের বন্ধুর ছেলে শাওন হাওলাদার বলেন, ‘সন্দেশের গুণগত মান ও দাম ধরে রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন যে পরিমাণে খাঁটি গরুর দুধের প্রয়োজন তা পাওয়া যাচ্ছে না। দাম অনেক বেশি। চিনির দামও ঊর্ধ্বগতি। পাশাপাশি ভ্যাট ও আয়করও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আগের দামে সন্দেশ বিক্রি করতে পারছি না।’
কারিগর শ্যামল চন্দ্র ভদ্র বলেন, ‘আমার পূর্বপুরুষ ছিলেন সতীশ চন্দ্র দাস। তিনি যে পদ্ধতিতে সন্দেশ তৈরি করতেন আমরা এখনো সেভাবেই তৈরি করি। এ জন্যই গুঠিয়ার সন্দেশের সঙ্গে দেশের আর কোনো জায়গার সন্দেশ মিলবে না।’
একই তথ্য দেন লেখক ও গবেষক আনিসুর রহমান খান স্বপন। তার মতে সন্দেশটি ঐতিহ্যবাহী হয়ে ওঠার পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। একটি হলো এর গুণগত মান ধরে রাখা, অন্যটি হচ্ছে আকৃতি। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টান্নটির জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে সরকার উদ্যোগ নিলে মান অক্ষুণ্ন রেখে বিশাল একটি অর্থনৈতিক উৎস হয়ে উঠতে পারে গুঠিয়ার সন্দেশ।’
বর্তমানে প্রতি কেজি সন্দেশ ৭০০ থেকে সাড়ে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজিতে ২২-২৩টি সন্দেশ পাওয়া যায়। প্রয়োজনে চাহিদা অনুযায়ী আলাদাভাবে অর্ডার দিয়ে আকার ছোট-বড় করিয়ে নেওয়া যায়।