চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় সমুদ্র উপকূলীয় সন্দ্বীপ চ্যানেলে অবৈধভাবে বালু তোলার মহোৎসব চললেও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এমনকি এ বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষ দেখভাল করে বলে নিজেদের দায় এড়িয়ে যাচ্ছে উপজেলা প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বছরের পর বছর প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ড্রেজার ও বাল্কহেড দিয়ে প্রকাশ্যে বালু তুলে উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে আসছে। ড্রেজার ও বাল্কহেডের মাধ্যমে দিন-দুপুরে প্রকাশ্যে বালু তোলা হচ্ছে। তবে কারা বালু তুলছে, সেটা জানে না বলে জানায় নৌ-পুলিশ। এর ফলে সাগরে গভীর খাদ দেখা দিচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার সৈয়দপুর, মুরাদপুরের গুলিয়াখালী, বাড়বকুণ্ডের মাদারীতোলা, বাঁশবাড়িয়ার আকিলপুর, সোনাইছড়ি, কুমিরাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার সন্দ্বীপ চ্যানেল প্রকাশ্যে বাল্কহেড দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে টানা কাজ চললেও নীরব ভূমিকায় উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা।
এদিকে ড্রেজারে বালু তোলার ফলে জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে পানির অস্বচ্ছতায় কমছে সামুদ্রিক মাছ। উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ভাঙনের পাশাপাশি জেলেদের মাছ ধরতে ভয়ের কারণ হচ্ছে।
কুমিরা কোস্টগার্ড কন্টিন্যান্ট কমান্ডার মোহাম্মদ শওকত আকবর জানান, বালু তোলার বিষয়গুলো নৌ-পুলিশ দেখছে। আর বালুর বিষয়গুলো চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলে তারা সেই কাজ করতে পারেন। বালু তোলার অনুমতির কোনো ডকুমেন্ট দিয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত কোনো ডকুমেন্ট আসেনি।’ তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার অভিযোগে বাল্কহেড ও ড্রেজার মালিকদের ২০টি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কুমিরা নৌ-পুলিশের ইনচার্জ ওয়ালি উদ্দীন আকবর।
স্থানীয় আকবর খান বলেন, ‘গত বছর ৫ আগস্ট সরকারের পটপরিবর্তনের পর সীতাকুণ্ডের সন্দ্বীপ চ্যানেলের পাঁচটি জায়গায় সাগর থেকে ড্রেজার বাল্কহেড দিয়ে মাটি তুলছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের অনুসারীরা। কেউ এই অবৈধ কাজের প্রতিবাদ করলে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও হয়রানির করা হচ্ছে। এমনকি সরাসরি ভুক্তভোগী জেলে সম্প্রদায়ের লোকরাও বাদ পড়ছে না।’
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সমুদ্রতল থেকে বালু তুলে উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলে নেতিবাচক পরিবর্তন, ভূগর্ভের পানি ও বায়ুদূষণ, প্রাকৃতিক ভূচিত্র নষ্ট করছে। এসব নেতিবাচক প্রভাবের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। মানুষও আক্রান্ত হচ্ছে। বালু তুলে সৃষ্ট বায়ুদূষণে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের মধ্যে পরিবর্তন ঘটার ফলে তাদের আবাসস্থল যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি তাদের খাদ্যের উৎসও ধ্বংস হচ্ছে। ফলে মৎস্য প্রজনন-প্রক্রিয়া পাল্টে যাওয়ার পাশাপাশি চাষাবাদের জমিও নষ্ট হচ্ছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারী লোকজন জেলেদের জাল কেটে দিয়েছে বলে অভিযোগ পেয়েছি।’ ড্রেজারে বালু তোলার বিষয়টি মাসিক আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে অভিযোগও করেছেন তিনি। তারপরও বালু তোলা বন্ধ হয়নি। তিনি জানান, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ২২ দিনের অভিযানে চলাকালে তিন বালু উত্তোলনকারীকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল। তবে যখন প্রজনন মৌসুম আসে, তখন সার্কুলার দেওয়া হয়। এ সময় অবাধে কোনো ধরনের ড্রেজার সাগরে চলতে পারে না।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘উপকূলীয় সাগর এলাকায় যেসব বালু তোলা হয়, সেটা দেখভাল করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে আমাদের জেলা প্রশাসনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’