বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রাম হিসেবে পরিচিত হবিগঞ্জের বানিয়াচং। গ্রামের চারপাশ ঘিরে রয়েছে ১৯ দশমিক ২ কিলোমিটারের ঐতিহাসিক ‘গড়ের খাল’। কৃষিকাজ, নৌচলাচল ও জলাবদ্ধতা নিরসনে খালটির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে সময়ের ব্যবধানে দখল ও দূষণে হারিয়ে যেতে বসেছিল খালটি। পরে সাত কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে খালটি খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল সারা বছর খালে পানি ধরে রেখে কৃষকের জমিতে সেচ নিশ্চিত করা। কিন্তু দেড় বছর না যেতেই খালের অস্তিত্ব বিলীন হতে বসেছে! স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। তাদের অভিযোগ, পুরো টাকাই লুটপাট হয়েছে।
যদিও খাল খননের কাজ শতভাগ না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্থানীয়দের বাধার কারণে অনেক জায়গায় খাল খনন করা যায়নি। এ ছাড়া ঠিকাদারের গাফিলতি থাকায় তাকে বিলের মাত্র ৫৪ শতাংশ পরিশোধ করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খালটি পুনরুদ্ধার ও খনন প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের আওতায় মূল খাল ছাড়াও শাখা মিলিয়ে ৩১ দশমিক ৬ কিলোমিটার খননের জন্য বরাদ্দ হয় ৭ কোটি ১৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের জায়গা নির্ধারণ না করেই খনন শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে ইচ্ছেমতো অপরিকল্পিভাবে খালটি খনন করা হয়। সেই সঙ্গে মূল খাল খনন না করে, অপ্রয়োজনীয় শাখা খাল খনন করা হয়েছে।
বানিয়াচং বাজারের ব্যবসায়ী আতাউর রহমান মিলন বলেন, ‘গড়ের খাল খনন যখন শুরু হয়, তখন আমরা অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম জমিতে সেচ দিতে পারব, খাল দিয়ে নৌকা চলাচল করবে। কিন্তু এখন বুঝতে পারলাম পুরো প্রকল্পটাই নেওয়া হয়েছিল লুটপাটের জন্য। খালের অর্ধেক কাজও হয়নি। যে জায়গাটুকু হয়েছে সেটিও অপরিকল্পিত।’
বানিয়াচংয়ের শেখের মহল্লা গ্রামের আজিজুর রহমান বলেন, ‘খালের জায়গা পুনর্নির্ধারণ না করেই খনন করা হয়েছে। খাল অনেকেই দখল করে ফেলেছে। কিন্তু সেটি উদ্ধার না করে তাদের ইচ্ছেমতো খাল খনন করছে। টাকা লুটপাটের জন্য মূল খাল রেখে খনন করেছে অপ্রয়োজনীয় শাখা খাল। যেগুলো সাধারণ মানুষের কোনো কাজেই আসবে না।’
ফজল মিয়া নামে ওই এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘খাল খননের নামে লুটপাট করা হয়েছে। এক্সকাভেটর দিয়ে খালের মাটি তুলে তীরে রাখা হয়। কয়েক মাস পরেই যখন বৃষ্টি এল, তখন সেগুলো আবার গড়িয়ে খালে চলে গেল। এ ছাড়া খাল অর্ধেকও খনন করা হয়নি। অনেক জায়গায় খালের কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাবেন না। বিভিন্ন মানুষ পুরো খাল দখল করে ফেলেছে।’
এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, ‘মূল খাল খনন করা হয়নি। আমাদের গ্রামের রাস্তার পাশে তারা খাল খনন করেছে। এতে গ্রাম থেকে যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বারবার অনুরোধ করার পরও কেউ আমাদের কথা শোনেনি। এখন আমরা নিজেরাই খালের মধ্যে বাঁধ দিয়ে রাস্তা বানিয়ে নিয়েছি।’
এদিকে প্রকল্প অনুযায়ী খালের দুই পাশে চার হাজার গাছ লাগানোর কথা। কিন্তু একটি গাছও লাগানো হয়নি।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ বলেন, ‘নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে পুরো খাল খনন করা সম্ভব হয়নি। অনেক জায়গায় খাল খনন করতে গেলে স্থানীয়রা বাধা দিয়েছেন। আমরা যতটা পেরেছি, করেছি। আমাদের তথ্য অনুযায়ী ৭০ শতাংশ খাল খনন করা হয়েছে। কিন্তু ওই কাজটিও সঠিকভাবে না করায় ঠিকাদারকে মাত্র ৫৪ শতাংশ বিল দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘‘বাকি টাকা কোথায় ব্যয় হয়েছে সেটা বলতে পারব না। যেহেতু এটি সারা বাংলাদেশের ‘নদী-খাল খননের প্রকল্প’, মানে ‘আমব্রেলা প্রজেক্ট’। তাই হয়তো এখানের বাকি টাকা অন্য কোনো জেলায় খরচ করা হয়েছে। সেটি আমার জানা নেই। এই প্রকল্পের একজন পরিচালক আছেন। তিনি ঢাকায় বসেন। তিনিই বলতে পারবেন টাকাটা কোথায় ব্যয় করা হয়েছে।’’