ঈদকে ঘিরে সুন্দরবনে বাড়তি সতর্কতা জারি করেছে বন বিভাগ। একই সঙ্গে সুন্দরবন রক্ষায় নিয়োজিত বনকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সুন্দরবনের ভেতরে দায়িত্বরত বনরক্ষীদের টহল জোরদার করতেও বলা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর ঈদের সময় চোরা শিকারি চক্র সুন্দরবনে হরিণসহ বন্যপ্রাণী শিকারে অপতৎপরতা চালায়। অপরদিকে, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের কলমতেজী ও শাপলার বিলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বেশ উদ্বিগ্ন বন বিভাগ। তাই হরিণ শিকার ও অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সুন্দরবনে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া সীমিত করা হয়েছে সুন্দরবন রক্ষায় নিয়োজিত বনকর্মীদের ঈদের ছুটি। ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২৮ মার্চ) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক এসিএফ মো. মসিউর রহমান।
তিনি জানান, সুন্দরবনে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। হরিণ ও বন্যপ্রাণী শিকার এবং অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সীমিত করা হয়েছে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন চারটি স্টেশনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঈদের ছুটি। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ছুটি দেওয়া হবে না।
তিনি আরও জানান, ঈদের বিশেষ এই সময়টাতে শিকারিদের অপতৎপরতা বন্ধ এবং অগ্নিসন্ত্রাসীদের নাশকতারোধে রেঞ্জের সব স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষ টহল কার্যক্রম পরিচালনারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, শনিবার সকালে সুন্দরবনের বিভিন্ন ফরেস্ট স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির কয়েকজন কর্মকর্তা ও বনরক্ষীর সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, 'সবাই একসঙ্গে ছুটিতে গেলে সুন্দরবনে নজরদারি করবেন কে? ঈদে পরিবারের সঙ্গে না থেকে বনে থাকতে খারাপ লাগলেও সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদেরই।'
শনিবার সকালে সুন্দরবনসংলগ্ন বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ঈদের ছুটিতে বাড়িতে না গিয়ে পরিবার-পরিজন ছেড়ে সুন্দরবনে কাজ করছেন বনরক্ষীরা। সেখানে কথা হয় বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, সুন্দরবনের চাকরিতে প্রায় ঈদেই ছুটি মেলে না। বিশেষ করে রোজার ঈদে বাড়িতে যেতে পারেন না। পরিবার ছাড়া ঈদ করা খুবই কষ্টের। তবে মানিয়ে নিতে হয়। এক সময় খারাপ লাগত। এখন আর খারাপ লাগে না।'
সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকা নটাবেঁকি টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমি সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে ২০১৮ সাল থেকে আছি। এর মধ্যে একবার মাত্র পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পেরেছি। গত বছর ঈদের সময় সুন্দরবনের এখানেই কর্মরত ছিলাম। গহিন বনের এই এলাকায় মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও পাওয়া যায় না। ঈদের দিন আমরা আটজন স্টাফ মিলে একটা ব্রয়লার মুরগি আর একটু সেমাই রান্না করে নিজেদের মতো করে ঈদ পালন করেছিলাম। এবারও তাই করব।’
সুন্দরবনের চুনকুঁড়ি টহল ফাঁড়িতে কর্মরত বনকর্মী সজল মজুমদার বলেন, ‘ঈদে পরিবার-প্রিয়জন নিয়ে সবাই যখন ঈদ আনন্দ উপভোগ করবে, ঠিক এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে আমরা (বনকর্মীরা) অবস্থান করব নির্জন সুন্দরবনে। আমি সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ায় কয়েকজনকে ঈদের নামাজ পড়তে লোকালয়ে পাঠিয়ে দিয়ে আমি বনে টহল করব। নামাজ শেষ হলে অন্যরাও টহলে যোগ দেবে। এই যে সবাই মিলেমিশে কাজ করছি, এর মাধ্যমেই গড়ে ওঠে সম্প্রীতির বন্ধন।’
সুলতান শাহাজান/জোবাইদা/