সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিছট এলাকায় খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে ১৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বাঁধ ভাঙার চার দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত বিকল্প বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, একদিকে ঈদ- অন্যদিকে জনবল সংকট থাকায় মেরামতকাজ তাৎক্ষণিকভাবে শুরু করা যায়নি।
গত বুধবার (২ এপ্রিল) থেকে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হলেও এটি শেষ হতে তিন থেকে চার দিন লাগবে। এতে নতুন করে আনুলিয়া, প্রতাপনগর ও খাজরা ইউনিয়নের আরও ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে দ্রুত বাঁধ মেরামতের উদ্যোগ না নেওয়ায় স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ ঈদুল ফিতরের দিন সকাল পৌনে ৯টার দিকে বিছট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশ থেকে খোলপেটুয়া নদীর ২০০ ফুট এলাকাজুড়ে বেড়িবাঁধ হঠাৎ করে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। স্থানীয় গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ভাঙন পয়েন্টে বিকল্প রিংবাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি।
বাঁধ ভেঙে এখন পর্যন্ত প্লাবিত হয়েছে আশাশুনি উপজেলার বিছট, বল্লবপুর, নয়াখালী, বাসুদেবপুর, আনুলিয়া, কাকবাসিয়া, মীর্জাপুরসহ ১৪টি গ্রাম। প্লাবিত এলাকার ৩০-৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
তলিয়ে গেছে ৫০০ বিঘা জমির ধান ও ৫ হাজার বিঘার বেশি চিংড়ির ঘের। এ ছাড়া পানির নিচে ডুবে রয়েছে প্রায় ১ হাজার বসতবাড়ি, ধসে পড়েছে শত শত কাঁচা ঘর। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সরেজমিনে আশাশুনির আনুলিয়া ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ বাড়িতে কোমরসমান পানি। ঘরবাড়ি ছাড়তে ব্যস্ত এলাকার মানুষজন। পানির চাপে ধসে পড়ছে মাটির দেয়াল। ঘরের ভেতর থেকে নিজেদের শেষ সম্বল বাইরে বের করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন ওই অঞ্চলের মানুষ।
তাদেরই একজন আনুলিয়া ইউনিয়নের ৭০ বছরের বৃদ্ধ মগবুল আলী। সবকিছু হারিয়ে ঘরের ভেতরে পানির মধ্যে বসে আছেন। চোখে-মুখে বিষণ্নতার ছাপ। মগবুল আলী বলেন, ‘এখন আমার খাওয়া, ঘুম নেই। বাঁধ ভাঙার দিন থেকে ওয়াবদার রাস্তায় দিন-রাত কাটাতে হচ্ছে। বর্তমানে ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোথায় যাব? কোথায় গিয়ে দুমুঠো ভাত খাব?’ বলতে গিয়ে কান্নাতে ভেঙে পড়েন তিনি।
বল্লভপুর গ্রামের বাসুদেব দাস জানান, শ্রমিকের কাজ করে মাটির গাঁথুনি দিয়ে একটি ঘর করেছিলেন। জোয়ারের পানিতে ঘরটি ভেঙে পড়েছে। বাড়ির জিনিসপত্রও সরানো যায়নি। গরু-ছাগলগুলো কোনোরকমে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এগুলো বেঁচে আছে কি না জানেন না।
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) আশাশুনি উপজেলা টিম লিডার আবদুল জলিল বলেন, ঈদের নামাজের সময় বাঁধ ভেঙে যায়। বিষয়টি জানামাত্র আমরা মোনাজাত না করেই সেখানে ছুটে যাই। পরে গ্রামবাসীকে নিয়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ রক্ষা করতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু দুপুরের জোয়ারের পর সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। মূল যে পয়েন্টটি ভেঙেছে, সেটাতে একটি পাইপলাইন ও গেট সিস্টেম ছিল। যতগুলো ভাঙন পয়েন্ট রয়েছে, সবগুলোই পাইপলাইনের কারণে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পানিবন্দি মানুষ এখন খাবার সংকটে পড়েছে। অনেক পরিবার উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ শুরু করলেও এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে আনুলিয়ার ইউপি চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস জানান, গত সোমবার রাত থেকে তার ইউনিয়নের মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। ঈদে তার ইউনিয়নের মানুষ আনন্দ করতে পারেনি। ইতোমধ্যে বিছট, নয়াখালী, বাসুদেবপুর, বল্লভপুর, আনুলিয়া, চেঁচুয়া, কাকবাশিয়া, চেওটিয়া, কপসান্ডা, পারবিছটসহ আরও অনেক গ্রাম পানিতে তলিয়ে ৩০-৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
এদিকে গত বুধবার সকাল আটটার দিকে রিংবাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, জিওটিউব দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে ন্যূনতম পাঁচটি বাল্কহেড দরকার, সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ড সরবরাহ করেছে মাত্র দুটি। এ জন্য কাজ চলছে ধীরগতিতে। যত সময়ক্ষেপণ হবে, ততই বাঁধের ভাঙন বাড়বে। এতে একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
আশাশুনিতে দায়িত্বরত পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাশিদুল ইসলাম বলেন, বাল্কহেড পাওয়া যাচ্ছে না। দক্ষ শ্রমিকেরও ঘাটতি রয়েছে। তার পরও বুধবার থেকে রিংবাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। আধুনিক পদ্ধতির জিওটিউব দিয়ে বাঁধের কাজ চলছে। এটি সফল হলে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পানি আটকানো সম্ভব হবে।