মধু সংগ্রহের সব প্রস্তুতি শেষ করেছেন আবু মুসা (৫৫)। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা এলাকার এই বাসিন্দা এরই মধ্যে তার নৌকার সব ধরনের সংস্কার করেছেন। আনুষঙ্গিক বাজারসদাই শেষ করেছেন। এখন শুধু বন বিভাগের পাস (অনুমতিপত্র) পাওয়ার অপেক্ষা।
এ জন্য গত সোমবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনে আসেন তিনি। জানান, পাস পেলে আটজন সহযোগীকে নিয়ে মধু সংগ্রহের উদ্দেশে সুন্দরবনে রওনা দেবেন। সেখানে টানা ১৪ দিন মধু আর মোম সংগ্রহ করে ফিরে আসবেন। এরপর আবার বনে গিয়ে আগামী ৩১ মে পর্যন্ত একই কাজ করবেন।
আবু মুসার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘মৌচাক থেকে যদি সময়মতো মধু আহরণ করা না হয় তাহলে ওই অঞ্চলে আর মধু হয় না। অভয়ারণ্য এলাকার চাক কাটা হয় না বলেই সুন্দরবনে দিন দিন মধু কমে যাচ্ছে। আমাদের দাবি, অভয়ারণ্য এলাকা মধু সংগ্রহের জন্য উন্মুক্ত করা হোক। তাহলে সুন্দরবনে আর মধুর অভাব হবে না।’
সেখানে থাকা মৌয়াল আকবর আলীও কথা বললেন আবু মুসার সুরে। ৪০ বছর ধরে মধু সংগ্রহের কাজ করা আকবরের বাড়ি একই উপজেলার গোদাড়া এলাকায়। তবে তার কথা থেকে কিছু বাড়তি তথ্য পাওয়া গেল। তিনি বলেন, ‘অভয়ারণ্য এলাকায় মধুর চাক না কাটায় আমাদের সুন্দরবন অংশে মধু কমলেও ভারতীয় অংশে বাড়ছে।’
মধু সংগ্রহের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘মৌমাছির চরিত্র অনুযায়ী, কোথাও সময়মতো চাক কাটা না হলে মৌমাছি আর ওই জায়গায় চাক বাঁধে না। আমাদের অভয়ারণ্য এলাকায় চাক কাটা হয় না, তাই মৌমাছি সুন্দরনের ভারতীয় অংশে চাক বাঁধে। এতে ওই অংশে মধুর পরিমাণ বাড়লেও আমাদের অংশে দিন দিন কমে যাচ্ছে।’
জানা গেছে, মৌসুম শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পর গত সোমবার থেকে সুন্দরবনে আনুষ্ঠানিকভাবে মধু সংগ্রহ শুরু হয়েছে। প্রতিবছর ১ এপ্রিল থেকে শুরু হলেও চলতি বছর ঈদুল ফিতরের ছুটির কারণে উদ্বোধন পিছিয়ে যায়। এদিন সকালে বুড়িগোয়ালিনী ৭১ নম্বর ফরেস্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চত্বরে বনবিভাগের আয়োজনে মধু সংগ্রহ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
তবে চলতি বছর মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অভয়ারণ্য এলাকায় মধু সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা, মৌসুম শুরুর আগেই জেলের ছদ্মবেশে বনে ঢুকে মধু সংগ্রহ এবং হঠাৎ বনদস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অপহরণের ভয়ে মধু আহরণে মৌয়ালদের আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। তারা দাদনের লাখ টাকা খাটিয়ে বনে ঢোকার সাহস পাচ্ছেন না।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর মৌয়াল ও নৌকার সংখ্যা অনেক কম। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৮২টি নৌকা মধু আহরণের জন্য পাস নিয়েছে। গত বছর প্রথম দিনেই ১৫৩টি নৌকা পাস নিয়েছিল।
মৌয়ালদের অভিযোগ, মৌসুম শুরুর আগেই অনেকে জেলের ছদ্মবেশে বনে ঢুকে মধু সংগ্রহ করেছেন। এর সঙ্গে রয়েছে তীব্র অনাবৃষ্টির প্রভাব। এসব কারণে এবার মধুর সংকট দেখা দিতে পারে। সুন্দরবনসংলগ্ন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাঁতিখালী গ্রামের মৌয়াল শাহাবাজ গাজী বলেন, ‘আমরা একটি নৌকায় ৯ জন মৌয়াল বনে যাচ্ছি। গত বছর দলের প্রত্যেক সদস্য দুই মণ করে মধু পেয়েছিলেন। পাস সংগ্রহ, সরকারি রাজস্ব এবং খাওয়া খরচ মিলিয়ে মৌসুমে একেক জনের খরচ হয় ১৩ থেকে ১৬ হাজার টাকা। আর দুই মণ মধু বিক্রি করে একেক জন পেয়েছিলেন ৬০ হাজার টাকা করে। এবার ওই পরিমাণ মধু পাওয়া যাবে না।’
জানা গেছে, ২০২৪ সালে পশ্চিম সুন্দরবন থেকে ১৫০০ কুইন্টাল মধু ও ৪৫০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ১২৩৫.৫০ কুইন্টাল মধু ও ৩৭০.৬৫ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ হয়। ২০২৫ সালে ১৫০০ কুইন্টাল মধু ৪০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশনের আওতায় সুন্দরবনের ১২টি টহল ফাঁড়ির মধ্যে চারটি অভয়ারণ্য রয়েছে। সেগুলো হলো পুষ্পকাটি, মান্দারবাড়িয়া, নটাবেঁকি ও হলদেবুনিয়া। এ ছাড়া দোবেকী ও কাঁচিকাটার ৫২ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য ঘোষিত।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মসিউর রহমান বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এই বনের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ দরকার। সুন্দরবনে প্রবেশাধিকার আরও সংরক্ষিত হওয়া দরকার।
তিনি বলেন, সুন্দরবনের ৫২ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে কোনো জেলে, বাওয়ালি বা বনজীবী প্রবেশ করতে পারেন না। ভবিষ্যতে আরও এলাকা অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হবে।