লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কথিত রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ছত্রছায়ায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। শহর ও গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় লাঠিসোঁটা ও অস্ত্র নিয়ে তাদের প্রকাশ্য মহড়া ও দৌড়াদৌড়ি নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোনো ব্যক্তি প্রতিবাদ করলেই তাদের লাঞ্ছিত ও মারধর করা হচ্ছে। চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মাদক ব্যবসাসহ সব ধরনের অপরাধেই জড়িয়ে পড়ছে তারা। এসব অপরাধীর অনেকে আবার জুয়া ও মাদকাসক্ত। এসব অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের একজনকেও আটক করতে পারেনি পুলিশ। এদিকে এদের নিয়ন্ত্রণও করা যাচ্ছে না। কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা রুখতে প্রতিটি ইউনিয়নে মতবিনিময় সভা হয়েছিল। সম্প্রতি উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় জেলা গোয়েন্দা সংস্থা থেকে কিশোর অপরাধী ও তাদের মদদদাতাদের তালিকা তৈরিরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিবিন্ন সূত্রে জানা যায়, গত ৩ এপ্রিল সন্ধায় রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চর আবাবিল ইউপির উদমারা গ্রামের লাঠিয়াল এলাকায় সমাজসেবক জাহাঙ্গীরসহ তার ছেলে, মেয়ে ও ভাইকে হামলা ও কুপিয়ে আহত করে স্থানীয় কিশোরগ্যাংয়ের সদস্যরা।
এ ঘটনায় ৭ এপ্রিল জোবায়ের, তানভির, নাবিল ও ছাব্বিরসহ ৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত পরিচয়ে আরও ১৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন আহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা। হামলাকারীরা স্থানীয় বিএনপি নেতা মামুনের অনুসারী বলে অভিযোগ করেছেন জাহাঙ্গীর।
এ ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার (১২ এপ্রিল) আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে রায়পুর শহরের ট্রাফিক মোড়ে মানববন্ধন করেছেন আহত ও ভুক্তভোগীদের স্বজন ও গ্রামবাসী। এসময় বক্তব্য রাখেন-নজরুল ইসলাম, মেহেদী হাসান, আবুল কাশেম, রায়হান, জাবের, আশ্রাফুল ও সাব্বির প্রমুখ।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, রায়পুরে শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। একেক দলে রয়েছে ১০ থেকে ১৫ জন। তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। উপজেলার বেশিরভাগ অপকর্মে কিশোর গ্যাং জড়িত বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করে।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর মানববন্ধন। ছবি: খবরের কাগজ
গত ৩ এপ্রিল সন্ধায় উপজেলার দক্ষিণ চরআবাবিল ইউপির উদমারা গ্রামের লাঠিয়াল এলাকায় রাস্তার পাশে বাড়ির সামনে টং ঘরে বসে মোবাইলে গেমস খেলছিল স্কুল ছাত্র জাবেদসহ তার বাড়ির কয়েকজন কিশোর। এসময় অন্ধকারে কে বা কারা তাদেরকে ঢিল ছোড়ে। এতে ওই কিশোররা গালমন্দ করে। এসময় ঘটনা জানতে চাইলে দিনমজুর আবুল কাশেমসহ ৩ জন কিশোর গ্যাংয়ের হামলার মুখে পড়েন। কাশেমের মাথায় ইট ও ছুরি দিয়ে জখম করা হয়। এ সংবাদ শুনে বড় ভাই জাহাঙ্গীর অন্য জায়গা থেকে বাড়িতে ছুটে আসলেই জোবায়ের, তানভির, নাবিলসহ ৮-১০ জন ধারালো ছেনি ও ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে তাদের। এসময় বাবাকে বাঁচাতে মেয়ে শারমিন এগিয়ে আসলে তাকেও কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে কিশোরগ্যাং সদস্যরা।
বর্তমানে জাহাঙ্গির (৫২) ও তার মেয়ে শারমিন আক্তার (৩০) ঢাকা মেডিকেল চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে তার ছোট ভাই জসিম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
এঘটনায় অভিযুক্ত কিশোর তানভিরের খোঁজে এলাকায় গেলে পলাতক থাকায় বক্তব্য নেওয়া যায়নি। তার মা তাসলিমা বেগম বক্তব্য দিতে চাইলে বিএনপি নেতা মমিন মোবাইল ফোনে জানান কোনো বক্তব্য দেওয়া যাবেনা, আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব বলে ফেন কেটে দেন।
অপরদিকে গত ১৬ মার্চ সন্ধার পর উদমারা গ্রামের লাঠিয়াল এলাকার মন্দিরের পাশের সুপারির বাগানে তাস খেলে স্থানীয় মৃত বরদা কান্ত শীলের ছেলে নাপিত সুদেব শীল মনুসহ তার বন্ধুরা। তাস খেলার অপরাধে মনুকে পিটিয়ে আহত করে স্থানীয় কিশোর গ্যাং সদস্যরা। এসময় স্থানীয় লোকজন আহত মনুকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। চারদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মনু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের হামলা ও নির্যাতনের ভয়ে কোনো প্রতিবাদ ও মামলা করতে সাহস করেনি তারা। বরং ভয়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে দুই ছেলে ও মেয়ে নিয়ে পালিয়ে এক নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে তারা। মোবাইল ফোনে গণমাধ্যম কর্মীদেরকে নিহতের স্ত্রী শিল্পি রানী শীল বলেন, কিশোর সন্ত্রাসীদের হুমকিতে তিনি সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হযেছেন। এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের আটক ও বিচারের দাবি করেছেন প্রতিবেশি, স্বজন ও এলাকাবাসী।
স্থানীয় ভুক্তভোগীরা বলেছেন, পুলিশ কিশোর গ্যাং ও তাদের মদদদাতাদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করলে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কমবে।
ছিনতাই বা আক্রমণের কবলে পড়েছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ কালে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বেশির ভাগের বয়স ১৪ থেকে ২২ এর মধ্যে। সন্ধ্যার পর উদমারা এলাকার রাজুগো, তেলিবাড়ি, অধিকারী বাড়ির সুপারি বাগান, মানুর পানের বরজ, বেড়িবাঁধসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় মাদক বেচা-কেনা, মোটরসাইকেল ও সাইকেল ছিনতাইসহ মানুষকে আক্রমণ করছে তারা।
জেলার পুলিশ সুপার আকতার হোসেন কিশোর অপরাধী ও তাদের মদদদাতাদের তালিকা তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড় বিট কর্মকর্তাদের তাদের বিটের নির্ধারিত এলাকায় কিশোর গ্যাং ও তাদের মদদদাতাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। থানা এলাকায় কারা কিশোর গ্যাং কালচারের সঙ্গে জড়িত, কিশোরদের মধ্যে কারা মাদক বিক্রি, মাদক পাচার ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত তাদেরও তালিকা করতেও বলা হয়েছে।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভুইয়া বলেন, উদমারা গ্রামে মারামারি ঘটনায় আহতদের পরিবারকে সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে মামলা করতে বলা হয়েছিল। তারা থানায় না করে আদালতে মামলা করেছেন। আসামিদের গ্রেপ্তার চেষ্টা চলছে। জুয়া খেলার অপরাধে পিটিয়ে আহত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাপিত মনু মারা যাওয়া ও পরিবার নিরুদ্দেশ এ ঘটনা তার জানা নেই।
তিনি আরও বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলায় অপরাধ পর্যালোচনা সভা হয়েছে। ওখানেও কিশোর গ্যাংয়ের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম/মাহফুজ