নগরজীবনের দুঃসহ চিত্র যেন প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে রংপুর শহরে। যান্ত্রিকতা ও অব্যবস্থাপনায় নানা ভোগান্তি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন নগরবাসী। জন্মনিবন্ধন, প্রত্যয়নপত্র, ড্রেন-রাস্তা, যানজট, মশার উপদ্রব প্রতিটি ক্ষেত্রেই আছে অভিযোগ। নগরবাসীর অভিযোগ, এসব সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
সম্প্রতি ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অফিসে গিয়ে দেখা যায়, দরজায় তালা লাগানো রয়েছে। সেখানে কথা হয় সেবা নিতে আসা রংপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যেকোনো কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য একাধিকবার আসতে হয়।’ ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতেমা জানান, কাগজপত্র ঠিক থাকলে দ্রুত সময়ে কাজ হয়ে যায়।
এদিকে শহরের রাস্তাঘাটগুলো ঠিকঠাক পরিষ্কার করা হয় না। কিছু জায়গায় ঝাড়ু দেওয়া হয় আবার কিছু জায়গায় দেওয়া হয় না। ২৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা শরাফত আলীর বলেন, ‘বর্তমানে রাস্তাঘাটগুলো যেন ময়লার ভাগাড় হয়ে গেছে। ময়লার দুর্গন্ধে বাইরে বসে থাকা যায় না। আগে প্রতিদিন পরিষ্কার হতো, এখন আর হচ্ছে না।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ২৭ নং কাউন্সিলর অফিস তালাবদ্ধ। ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা মিজানুর রহমান সুমনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘দিনে আমাদের সিটি করপোরেশনে কাজ করতে হয়। সন্ধ্যার পর আমরা অফিসে বসি। একটা পরিবারের অভিভাবক না থাকলে সেই পরিবারটা কীভাবে চলে আপনি নিজেও জানেন। কাউন্সিলর থাকতে রাত ২টা-৩টার সময়ও লোকজন আমাদের কাছে আসতেন। কাজ করে দিতাম। এই মুহূর্তে আমার ওয়ার্ডের প্রত্যেকটা নালা ময়লায় ভর্তি হয়ে গেছে, কার কাছে যাব? কিছুদিন পরে বর্ষাকাল আসবে। ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে। সিটি করপোরেশনে বললে কেউ গুরুত্ব দেয় না।’ রসিকের সহ-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান মিজু জানান, কাজের কোনো পরিবর্তন হয়নি, চলমান রয়েছে। আগে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা রাতে কাজ করতেন, এখন দিনে কাজ করছেন।
দীর্ঘদিন পরে থাকা ময়লা, আর অপরিচ্ছন্ন ড্রেনেজব্যবস্থায় বেড়েছে মশার উপদ্রব। কোথাও দাঁড়িয়ে থাকারও সুযোগ নেই। দিনের বেলায়ও মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হচ্ছে। নগরবাসীর অভিযোগ, আগে মশা দমনে ফগার মেশিন ব্যবহার করা হলেও এখন করা হয় না। লার্ভা নিধনে কোনো ধরনের ওষুধ ছিটানো হয় না। ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী শোয়াইব হক শিবতী বলেন, ‘এত বেশি মশার উপদ্রব আগে কখনো দেখিনি। টেবিলে পড়তে বসলে মশার কারণে পড়াশোনা হচ্ছে না। আমরা অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। মশার সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করে চলতে হচ্ছে।’
এ বিষয়ে সহ-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা বলেন, সকালে লার্ভিসাইড মেশিন, বিকেলে ফগার মেশিন দিনে মশা নিধনের চেষ্টা চলছে। ওষুধ ছিল না, সে জন্য কিছুদিন কাজ করা হয়নি। ১২ ড্রামের আবেদন করেছি। ৪ ড্রাম পেয়েছি। ড্রেন পরিষ্কারের ব্যাপারে ই-টেন্ডার করা হচ্ছে।’
অন্যদিকে তীব্র যানজটে নাকাল অবস্থা নগরবাসীর। যানজটের কারণে ঠিকমতো কাজে যেতে পারছেন না অনেকেই। ব্যাটারিচালিত রিকশা আর ফুটপাতে অবৈধ দোকানে ভরে গেছে শহর। এ ছাড়া আগে ছোট ছোট রাস্তা খুব দ্রুত মেরামত করা হলেও এখন করা হচ্ছে না। ২২ নং ওয়ার্ডের ইন্দ্রামোড় থেকে নিউ জুম্মাপাড়া পাকার মাথার রাস্তা দীর্ঘদিন খানাখন্দে ভরা থাকলেও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এতে এলাকাবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বলেন, ‘আমরা রাস্তাঘাটগুলো সংস্কারের চেষ্টা করছি। যানজট নিরসন ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে আমাদের অভিযান নিয়মিত চলছে।’ রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কাজের গতি কমে যাওয়ার কারণ হলো কর্মকর্তাসংকট রয়েছে। আমি অতিরিক্ত দায়িত্বে আছি। মশার ওষুধ ছিল না বলে কাজ করা হয়নি। এখন এসেছে, কাজও শুরু হয়ে যাবে।’