নছিমন, করিমন, ভটভটি, আলমসাধু, স্টিয়ারিং ট্রলি, লাটাহাম্বা- এ রকম অদ্ভুত নামের শ্যালো ইঞ্জিনচালিত তিন-চার চাকার গাড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কুষ্টিয়ার সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে। দেশীয় প্রযুক্তিতে নানা কাঠামো বসিয়ে তৈরি করা রকমারি গাড়ি এগুলো। এখন পর্যন্ত সেসবের নেই কোনো বৈধতা। বৈধতা না থাকলেও অতিরিক্ত মালামাল নিয়ে বেপরোয়া গতিতে জেলার মহাসড়ক থেকে শুরু করে ছোট গ্রামীণ সড়ক যেন দখল করে আছে এই অবৈধ যানবাহনগুলো। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে দিয়ে বীরদর্পে চলাচল করলেও কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। এ কারণে প্রতিবছর জেলায় সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে।
সচেতন সমাজ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্যালো ইঞ্জিনচালিত গাড়ির দৌরাত্ম্যে সড়কে দুর্ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুতর আহতাবস্থায় পঙ্গুত্বকে সঙ্গী করে জীবনযাপনের মিছিলও বড় হচ্ছে। অদ্ভুত এসব গাড়ির কোনো প্রকৌশলগত ব্যাখ্যাও নেই। গাড়িচালকের প্রশিক্ষণও নেই। এগুলো ব্যবহার হয় শুধু একটি দুষ্টচক্রের মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার লোভে।
জানা গেছে, দেশের সবচেয়ে বেশি অবৈধ যানবাহন তৈরির কারখানা রয়েছে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ভাদালিয়া বাজারে। পুরো জেলায় শতাধিক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় প্রতি মাসে শত শত নছিমন, করিমন, ট্রলি ও ভটভটি তৈরি হচ্ছে। চীন থেকে শ্যালো ইঞ্জিন এনে নিজেদের মতো যানবাহন তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছে। এমনকি ছোট ছোট ট্রাক তৈরি করা হচ্ছে এসব কারখানায়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
২০২০ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কুষ্টিয়া জেলা থেকে সব ধরনের অবৈধ যান তৈরির কারখানা বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিল জেলা পুলিশ। সে সময় জেলার সব নছিমন, করিমন ও ভটভটি তৈরির কারখানার মালিককে ডেকে সময় বেঁধে দিয়েও কাজ হয়নি। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ওই সময় জেলায় ৭০টি কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। কারখানাগুলোর মালিকের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুষ্টিয়ার ছয়টি উপজেলায় অন্তত তিন হাজার শ্যালো ইঞ্জিনের গাড়ি ব্যবহৃত হচ্ছে ‘স্টিয়ারিং ট্রলি’ নামে। দুই হাজারের মতো অন্যান্য নাম ও কাঠামোয়। প্রতিদিন বাইরে থেকে প্রবেশ করা গাড়ির সংখ্যা আরও অন্তত হাজারখানেক। সব মিলিয়ে ছয় হাজারের মতো শ্যালোর গাড়ি প্রতিনিয়ত চলছে জেলার সড়ক-মহাসড়কে।
উদ্বেগজনক তথ্য হলো- কুষ্টিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যার অন্তত ৬০ শতাংশ শ্যালো ইঞ্জিনচালিত বিভিন্ন গাড়ির কারণে হয়ে থাকে। বাকি ৪০ শতাংশের অধিকাংশ ড্রাম্প ট্রাকের কারণে ঘটে। কুষ্টিয়ায় এ ধরনের গাড়ি মূলত পণ্য পরিবহন, গবাদি পশু পরিবহন, নির্মাণসামগ্রী পরিবহন, বালু পরিবহন, ইটভাটায় মাটি সরবরাহ ও মাটি পরিবহনকাজে ব্যবহার হয়ে আসছে।
শ্যালো ইঞ্জিনচালিত গাড়ি আদৌও অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব রাখছে কি না জানতে চাইলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তফা আরিফ জানান, কুষ্টিয়া ও আশপাশের জেলাগুলোতে এ যেন অদ্ভুত এক শিল্প গড়ে উঠেছে! শ্যালো ইঞ্জিনের এসব গাড়ি অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব রাখার ন্যূনতম সম্ভাবনা নেই। বরং মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি এবং দুর্ঘটনার মতো ঘটনায় অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি বাড়ছে। শুধু সুবিধাভোগী শ্রেণির লাভের সূচক ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। এসব অবৈধ যানবাহনের বিকল্প ভাবা উচিত।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এসব গাড়ি নির্মাণ কতটা যৌক্তিক জানতে চাইলে কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মেকানিক্যাল টেকনোলজি বিভাগের চিফ ইনস্ট্রাক্টর বিপুল কুমার কুণ্ডু জানান, এসব গাড়ির প্রকৌশলগত কোনো উপযুক্ত ব্যাখ্যা নেই। এগুলো বিপজ্জনক, যা সড়কে দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে।
পাওয়ার টেকনোলজি গবেষকরা বলছেন, এসব গাড়ির মূল সমস্যা ব্রেকিং সিস্টেমে। ব্রেকিং সিস্টেম অনুপযুক্ত হওয়ায় দুর্ঘটনাপ্রবণ। তবে গাড়িগুলো প্রকৌশলগত দিক থেকে মডিফাই করে এবং চালকদের প্রশিক্ষিত করে চালানো যেতে পারে। নতুবা এটি ঝুঁকিপূর্ণ।
বেশ কয়েকজন চালক ও শ্রমিকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, গাড়ির ইঞ্জিনের বিকট শব্দে চালকের আসনে বসে চলতি অবস্থায় আশপাশের কোনো হর্ন বা চিৎকার শোনা সম্ভব নয়। ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার বেগের ওপরে থাকলে ব্রেক করে গাড়ি থামাতে বেশ সময় ও দীর্ঘ জায়গা প্রয়োজন হয়, যা ব্যস্ত সড়কে প্রায় অসম্ভব। পাশাপাশি ডানে-বায়ে গাড়ি ঘোরার যে পদ্ধতি, তাতেও ত্রুটি রয়েছে। চালক ও সহযোগীর আসনে সার্বক্ষণিক অসহনীয় ঝাঁকুনি থাকে। ঝুঁকি জেনেও তারা এ কাজে আছে জীবিকার প্রয়োজনে।
এ ধরনের গাড়ির স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম জানান, জনসাধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকি তো আছেই। পাশাপাশি চালকের চেম্বারের ভাইব্রেশন, হিট, শব্দ ও রাসায়নিক মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে দেহের সব মূল অর্গানসহ সারা দেহে ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করবে। এ ছাড়া ক্যানসারের ঝুঁকিও রয়েছে।
কুষ্টিয়া হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ আল মামুন বলেন, ‘সড়ক-মহাসড়কে এসব গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নিয়মিত অভিযানে আমরা মামলা করছি, জরিমানা করছি। নানা প্রতিকূলতার জন্য এত কিছুর পরও এই গাড়িগুলো বন্ধ করা যাচ্ছে না। তবে জেলা প্রশাসকের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এসব গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব।’
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) কুষ্টিয়ার সভাপতি রফিকুল ইসলাম টুকু বলেন, ‘যে যানবাহনটির কোনো বৈধতা নেই, তা যখন সড়কে দাপিয়ে বেড়ায় আমরা শুধু শিহরিত হই না, অবাকও হই। অবৈধ যানবাহনচালকের কাছে গোটা প্রশাসন এখন জিম্মি। অথচ এটি নির্মাণের শুরু থেকেই যদি পদক্ষেপ নেওয়া যেত, তাহলে আজ শ্যালো ইঞ্জিনচালিত এসব বাহন ব্যাপক প্রসার লাভ করতে পারত না। সড়কে অপমৃত্যুর মিছিলও দেখা যেত না।’
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘এগুলো সারা দেশে অবৈধভাবে চলছে। এগুলো দমনে জিরো টলারেন্স নেওয়া কঠিন ব্যাপার। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা সেটার ব্যবস্থা নেব।’