যশোরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন অন্তত ১০টি সড়কের কাজ বন্ধ রয়েছে। কয়েক বছর আগে শুরু হওয়া সড়কগুলোর কাজ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এখনো শেষ করতে পারেনি। এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকরা আওয়ামী লীগ ঘরানার হওয়ায় বর্তমানে তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বেশির ভাগ কাজের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে।
শুধুমাত্র ম্যাকাডামের (সড়কের একটি নির্মাণ পদ্ধতি যেখানে পিষে ফেলা পাথর বা নুড়িপাথর আলকাতরা বা অন্যান্য বাইন্ডার দিয়ে মিশ্রিত করা হয়) কাজ করে দীর্ঘদিন ফেলে রাখায় রাস্তাগুলো খানাখন্দে ভরে গেছে। ভাঙা খোয়ার লাল ধুলো আর বালিতে পথচারীদের এখন নাস্তানাবুদ অবস্থা। বেশির ভাগ সড়কই চলাচলের অনুপযাগী হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা রাস্তার কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছেন।
যশোর এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, যশোর সদর উপজেলার উপশহর তৈলকূপ বাজার সড়কের কাশিমপুর থেকে দিঘিরপাড় পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার সড়কের কার্পেটিংয়ের কাজ পায় ঠিকাদার শরিফুল ইসলাম। ওই সড়কের কাজ হয়েছে মাত্র ৬০ শতাংশ। সদর উপজেলার হুদার মোড় থেকে হাপানিয়া হয়ে ফুলবাড়ি পুলিশ ক্যাম্পের ১ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার সড়কের
কার্পেটিংয়ের কাজ পায় ঠিকাদার হানিফ ট্রেডিং অ্যান্ড স্টিল হাউস। সড়কটির কাজ হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। শর্শনাদাহ-ভবানিপুর সড়কের এক দশমিক ৭০ কিলোমিটার সড়কের কাজ পায় ঠিকাদার মেসার্স নাহিদ এন্টারপ্রাইজের আব্দুর রউফ। ২০২৪ সালের জুনে রাস্তার কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। ওই সড়কে মাত্র ৪০ শতাংশ কাজ হয়েছে।
এ ছাড়া মনোহরপুর যোগীপাড়া থেকে ওসমানপুন সড়কে এক দশমিক ৭০ কিলোমিটার সড়কের কাজ পায় মেসার্স রেনু এন্টারপ্রাইজের আনন্দ বিশ্বাস। কাজ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। মেয়াদ শেষে কাজ হয়েছে মাত্র ৬০ শতাংশ। দেয়াড়া ইউনিয়নের নতুনহাট থেকে দত্তপাড়া সড়কে ২ দশমিক ৫০ কিলোমিটার সড়কের ৬০ শতাংশ কাজ হয়েছে।
বলাডাঙ্গা-মথুরাপুর সড়কের ২ দশমিক ১৭ কিলোমিটার, মালঞ্চী কোল্ড স্টোর হতে আরাবপুর ইউপি সড়কে ১ দশমিক ৭২ কিলোমিটার সড়কের কাজ পায় মোড়ল ইন্টারপ্রাইজের শাহরুল ইসলাম। কাজ হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। বসুন্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সেবানন্দপুরের খেয়াঘাট সড়কে ৪ দশমিক ১১৩ কিলোমিটার সড়কের কাজ পায় লিপু এন্টারপ্রাইজ। কাজ হয়েছে মাত্র ৬০ শতাংশ। এ ছাড়া কেসমত হৈবতপুরে ২ দশকি ১৮ কিলোমিটার রাস্তার কাজ হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ। একই অবস্থা চুড়ামনকাঠি এলাকায় একটি সড়কের।
সূত্র আরও জানিয়েছে, এসব সড়কের কাজ শেষ করার মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ঠিকাদারদের গাফলতির কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পাদন হয়নি। এসব কাজের অধিকাংশ ঠিকাদার আওয়ামীপন্থি হওয়ায় তারা এখন এলাকায় নেই।
এদিকে দীর্ঘদিনেও কাজ শেষ না হওয়ায় ওই সব সড়কের ব্যবহারকারীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। যশোর উপশহর এলাকার ইজিবাইকচালক আলম বিশ্বাস বাবু বলেন, ‘রাস্তায় ইট বিছিয়ে বছরের পর বছর ফেলে রাখা হয়েছে। বর্তমানে চলার কোনো উপায় নেই। একদিকে লাল ধুলো, অন্যদিকে রাস্তা ভেঙে গর্ত হয়ে গেছে। চলাচলের সময় গাড়ি উল্টে যায়। আর বৃষ্টি হলে তো চলার কোনো উপায় থাকে না।’
সালতা গ্রামের ইউসুফ মোল্লা জানান, এই রাস্তা দিয়ে প্রায় ২০-২৫ গ্রামের মানুষ যাতায়াত করে। কিন্তু বর্তমানে এমন অবস্থা যে, কোনো রোগী নেওয়ার পথে আরও মুমূর্ষু হয়ে পড়বে। রাস্তার ম্যাকাডামের কাজ করে বছর বছর ফেলে রাখায় সড়ক উঁচু নিচু হয়ে গেছে।
হৈবতপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেন জানান, ঠিকাদাররা এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত রাস্তা খুঁড়ে রাখে। এরপর খোয়া দেয়। কার্পেটিং দেওয়ার তো কোনো খোঁজ নেই। শর্শনাদাহ গ্রামের কামাল আহম্মেদ জানান, শর্শনাদাহ-ভবানীপুরের মধ্যে এই রাস্তাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কয়েক বছর আগে রাস্তাটির মাটি খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। এ রাস্তা দিয়ে কৃষকের সবজি-ধান মাঠ থেকে উঠাতে খুবই ভোগান্তি হয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী চৌধুরী মোহাম্মদ আসিফ রেজা বলেন, কয়েকটি গ্রামীণ সড়কের কাজ ঠিকাদার ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ করছে। কাজের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। ঠিকাদারের অবহেলার কারণে সময়মতো কাজ শেষ হয়নি। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এলজিইডি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘অনেক সড়কে কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ না করে ঠিকাদাররা ফেলে রেখেছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ডেকে দ্রুত কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মধ্যে কাজগুলো শেষ করতে বলা হয়েছে। ঠিকাদাররা কাজ না শুরু করলে রি-টেন্ডার করা হবে।’