৫ আগস্ট ২০২৪। ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। ওইদিন রাজশাহীতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংস হামলা হয়। এতে সাকিব আনজুম সবুজ (২৭) নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হন। ওই দিনের হামলায় আহত হয়ে তিন দিন পর মারা যান আরেক শিক্ষার্থী রায়হান আলী (২৮)। গতকাল মঙ্গলবার ওই হামলার ঘটনার এক বছর পূর্ণ হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত দুই শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তদন্ত শেষ হয়নি। বিষয়টি নিয়ে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তারা সন্তান হত্যার বিচারের আশায় দিন গুনছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজশাহীতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-যুবলীগের নেতা-কর্মীদের ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী সাকিব আনজুম সবুজ নিহত হন। এ ছাড়া আহত হন উভয়পক্ষের কমপক্ষে ৫০ জন। তাদের মধ্যে ৪০ জনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৪০ জনের মধ্যে ৩০ জনই ছিলেন গুলিবিদ্ধ। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ আগস্ট মারা যান রায়হান আলী।
নিহত সাকিব আনজুম সবুজ রাজশাহী নগরীর রানীনগর এলাকার মাইনুল হকের ছেলে। তিনি বেসরকারি বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। ঘটনার সময় ধাওয়া খেয়ে শাহ মখদুম কলেজসংলগ্ন একটি বাড়িতে তিনি আশ্রয় নেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা সেখানে ঢুকে তার গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেন। অন্যদিকে নিহত আলী রায়হান রাজশাহী কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন। তিনি পরবর্তী সময়ে রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।
রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের তথ্যমতে, এই দুই শিক্ষার্থীকে হত্যা ও গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় রাজশাহী বিভাগজুড়ে ১২৮টি মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলা ২২টি। সবচেয়ে বেশি ৯টি হত্যা মামলা হয়েছে বগুড়ায়, সিরাজগঞ্জে আটটি, রাজশাহী ও জয়পুরহাটে দুটি করে এবং পাবনায় একটি। সব মিলিয়ে ২২টি হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি ১ হাজার ৯৪৯ জন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৯০০ জন।
তবে তদন্ত নিয়ে শুরু থেকেই জটিলতা দেখা দেয়। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থিরতার মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অনেক মামলা হয়। কোথাও ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন হওয়ায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সমস্যা হয়। আবার কিছু মামলার সুরতহাল প্রতিবেদনের সঙ্গেও অসঙ্গতি দেখা যায়। এমন প্রেক্ষাপটে তদন্তে ধীরগতি আসে। পরে রাজশাহী রেঞ্জে একটি মনিটরিং সেল গঠন করে পুলিশ। মনোনীত ১১৮টি গুরুত্বপূর্ণ মামলার তালিকায় রয়েছে ২২টি হত্যা মামলা। এর মধ্যে মাত্র ছয়টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আরও কয়েকটি মামলার প্রতিবেদন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
সাকিব আনজুমের বাবা মাইনুল হক বলেন, শুরুর দিকে মামলার তদন্তে গাফিলতি ছিল। তখনকার কর্মকর্তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তবে এখন যারা আছেন, তারা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। আমরা চাই, প্রকৃত দোষীরা শাস্তি পাক, নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেছেন, ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণসহ প্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অনেক আসামিকে শনাক্ত করা গেছে। কিছু ভিডিও ফুটেজের ফরেনসিক প্রতিবেদন পেলে তদন্ত শেষ করা যাবে।
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেছেন, প্রাথমিক তথ্য যাচাই-বাছাই করে আমরা নিশ্চিত হতে চাই, যেন নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার না হয়। প্রকৃত দোষীরা যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়।