ছকিনা খাতুন (৬৬) সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার কৈজরী ইউনিয়নের হাটপাঁচিল গ্রামের বাসিন্দা। তিন বছর আগে নদীভাঙনে তার একমাত্র বসতঘরটি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। আর কোনো জমিজমা না থাকায় উপায় না পেয়ে বর্তমানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কিনারে ছাপরা ঘর তুলে অনেক কষ্টে দিন পার করছেন।
একই অবস্থা ওই গ্রামের তয়জাল ব্যাপারীর। তিনি জানান, তিন বছর আগে যমুনা নদীতে তার বসতবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। তিনি এখন নিঃস্ব, তার সম্বল বলতে কিছুই নেই। চার সদস্যের পরিবার নিয়ে ওয়াপদা বাঁধের পাশেই একজনের জায়গা ৯ হাজার টাকায় বার্ষিক ভাড়া নিয়ে একটি ঘর তুলে বসবাস করে আসছেন। একটি মাত্র ঘরের মধ্যে পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে থাকা-খাওয়ার সমস্যা হচ্ছে তার। কিন্তু কিছুই করার নেই।
হাটপাঁচিল গ্রামের ভোগল ব্যাপারীও (৫৭) নদীভাঙনে বাড়িঘর ও জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। অন্যের জমিতে বছরে ১০ হাজার টাকা ভাড়ায় ছাপরা ঘর তুলে কোনোমতে জীবনযাপন করছেন।
একই গ্রামের আলেয়া খাতুন, লালটু শেখ, মালেকা খাতুন, শুকুর ফকির, মরতুজ আলী, মাজেদা খাতুন, চেনভানু, নাসিমা খাতুন, পরশ আলী, খোদেজা খাতুন, আজাদ মণ্ডল, কুলছুম বেগম, গিয়াস উদ্দিন ও রবিচান মণ্ডলসহ অনেকে জানান, সর্বনাশা যমুনা নদী তাদের জমিজমা, বাড়িঘর সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। তারা সবকিছু হারিয়ে সম্বলহীন হয়ে বর্তমানে বিভিন্ন বাঁধে, খাস জমিতে ও অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের দেখার কেউই নেই।
জানা যায়, গত কয়েক বছরে যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনে বাড়িঘর, বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়েছে হাটপাঁচিল গ্রামের নদীপাড়ের শতাধিক পরিবার।
এ গ্রামের বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন বলেন, গ্রামের শতাধিক পরিবারের বসতবাড়ি ও শত শত বিঘা কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় শত শত পরিবার এখন ভূমিহীন।
ওই গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, ‘ভাঙনে বাড়িঘর, ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। সব হারিয়ে অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে ঘর তুলে পরিবার-পরিজন নিয়ে বাস করছি। এই জমিতে পটোল, বেগুন, ধান, বাদাম, মাষকলাই, বাঙ্গি, সবজি, ধনিয়াসহ সব ধরনের ফসল উৎপাদন হতো। এসব ফসল ফলিয়ে ভালোই দিন কাটছিল। কিন্তু সবকিছু নদীতে চলে যাওয়াতে কী খাব- তা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়েছি।’
বাবু নামে এক কৃষক বলেন, এই এলাকার মাটি খুব উর্বর ছিল। এখানে যে ফসলই বোনা হতো, ব্যাপক ফলন হতো। কিন্তু নদীভাঙনে একে একে সব জমিই হারিয়ে গেছে। ফলে গ্রামের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
হাটপাঁচিল গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল মোল্লা, জয়ভানু, জিল্লুর রহমান, বক্কর মোল্লা, আলী ব্যাপারীসহ আরও অনেকে অভিযোগ করে বলেন, ৬৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর ডান তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ চলছে ধীরগতিতে। যদি পাউবোর ঠিকাদাররা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণের কাজটি শেষ করতে পারতেন তাহলে গ্রামের অনেক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীভাঙন থেকে রক্ষা পেত, নদীতে বিলীন হতো না। শতাধিক পরিবার ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি হারিয়ে একেবারে পথের ফকির হয়ে গেছে।’
এই গ্রামের যুবক ইয়াসিন চতুর বলেন, তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে সরকার ৬৫৩ কোটি টাকার প্রকল্প দিলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিতে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ হয়নি। যার কারণে নদীপাড়ের মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকেই বাড়িঘর হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য তারা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে আবেদন করলেও তেমন একটা সাড়া ও সহযোগিতা পাননি। যদি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা তাদের সাহায্য এগিয়ে আসত, সেই সঙ্গে মাথা গোঁজার জন্য ঘরের ব্যবস্থা করে দিত- তাহলে অনেক উপকার হতো।
শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান ভাঙনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গত কয়েক বছরে নদীভাঙনে অনেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান বলেন, যমুনা নদীর ভাঙন রোধে ‘সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার ব্রাহ্মণগ্রাম-হাটপাঁচিল তৎসংলগ্ন এলাকায় যমুনা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ এবং বেতিল স্পার-১ ও এনায়েতপুর স্পার-২ শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের কাজ অনেকাংশে শেষ হয়েছে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৫৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে ওই এলাকায় আর নদীভাঙন থাকবে না।