পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জেলার সীমান্তবর্তী তিন উপজেলায় এই রোগে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। গেল সাত মাসে পুরো জেলায় প্রায় আড়াই হাজার মানুষ মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া দুই শিশু মারা গেছে। এতে জেলাজুড়ে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এমন অবস্থার জন্য দুর্গম অঞ্চল, মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব ও স্বাস্থ্য বিভাগের জনবল সংকটকে দায়ী করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের যে লক্ষ্য সরকার নির্ধারণ করেছে তা বাস্তবায়নে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের এক-দশমাংশ অঞ্চল পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকা। প্রতিবছর এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ম্যালেরিয়া প্রকোপ দেখা দেয়। বিশেষ করে ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে রাঙামাটি জেলার সীমান্তবর্তী জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকল ও বাঘাইছড়ি উপজেলায় ম্যালেরিয়া ছড়ায় বেশি।
ম্যালেরিয়া শনাক্ত হওয়ার পর রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন সদর উপজেলার বন্দুকভাঙা এলাকার বাসিন্দা কলেজশিক্ষার্থী নয়ন চাকমা (১৮)। তিনি বলেন, ‘১৬ আগস্ট জ্বর আসে। ২০ আগস্ট পরীক্ষা করে ম্যালেরিয়া ধরা পড়ে। ওই দিনই এখানে ভর্তি হই।’ নয়ন চাকমার মা মালতি চাকমা বলেন, ‘বাড়িতে থাকলে আমরা মশারি টানাই। কিন্তু ঘরের বাইরে গেলে মশা কামড়ায়। সন্ধ্যা হলেই মশার উৎপাত বেড়ে যায়।’
হাসপাতালে ভর্তি থাকা সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী পারমী চাকমার বাবা বকুল চাকমা বলেন, ‘আমার মেয়ের ২০ দিনের মতো জ্বর ছিল। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। জ্বর কমছিল না। রক্ত পরীক্ষা করলে ম্যালেরিয়া ধরা পরে। পরে হাসপাতালে ভর্তি করি।’
হাসপাতালের বেডে মশারি টানিয়ে শুয়ে আছেন সদর উপজেলার বালুখালীর বাসিন্দা জিকু চাকমা (২৫)। বললেন, ‘জ্বর হওয়ার পাঁচ দিন পর রক্ত পরীক্ষা করেছি। তখন ম্যালেরিয়া ধরা পড়ে। ডাক্তার এখানে ভর্তি হতে বলেন। বাড়ির সবাই মশারি ব্যবহার করে। শুধু আমি মাঝে মাঝে ব্যবহার করি। এ জন্যই মশা কামড়েছে।’
বাঘাইছড়ি উপজেলার রনজ্যোতি চাকমা (৫০) নিজের বাগানে হলুদের চাষ করেন। তার ধারণা সেখানে কাজ করার সময় তিনি মশার কামড়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। এখন তিনি রাঙামাটি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। বলেন, ‘বাগানে প্রায়ই যেতে হয়। বাসায় মশারি টানাতে পারি, ওখানে তো সেটা সম্ভব না। হয়তো সেখানেই আক্রান্ত হয়েছি।’
সিভিল সার্জন অফিস বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে রাঙামাটির ১০ উপজেলায় ২ হাজার ৪২৬ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে শুধু জুন মাসে সর্বোচ্চ ৯৮৬ ও জুলাইয়ে ৭৬৪ জন আক্রান্ত হন। এ ছাড়া গত ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাঙামাটির বিলাইছড়ির সাড়ে চার বছর বয়সী প্রত্যাশা তঞ্চঙ্গা মারা যায়। আর ১২ জুলাই রাঙামাটি সদর হাসপাতালে মারা যায় জেলার বন্দুকভাঙার বাসিন্দা দশ বছরের সুদীপ্তা চাকমা।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালে ১ লাখ ৭২ হাজার ৪২৪ জনের ম্যালেরিয়া পরীক্ষা করা হয়। শনাক্ত হয় ৯ হাজার ৬২৪ জন। মৃত্যু হয় একজনের। তবে ২০১৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ম্যালেরিয়ায় কোনো মৃত্যুর রেকর্ড স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে নেই।
২০১৬ সালে একজনের মৃত্যুর আট বছর পর চলতি বছর ম্যালেরিয়ায় দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে পাহাড়ে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, এক বছরে প্রতি হাজার মানুষের মধ্যে একজনের বেশি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত এলাকাকে উচ্চ ঝুঁকির হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই পর্যবেক্ষণে পার্বত্য তিন জেলা রয়েছে ম্যালেরিয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে। এমন পরিস্থিতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলে সরকারের যে লক্ষ্য তা অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে ২০১৭ সালে জেলায় ৮২৮৭ জন ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্ত হয়। এ ছাড়া ২০১৮ সালে ৩০১৪ জন, ২০১৯ সালে ৬০৬৬ জন, ২০২০ সালে ১৩৯০ জন, ২০২১ সালে ১৫৫৬ জন, ২০২২ সালে ৩২১৯ জন। ২০২৩ সালে ৪৭১৪ জন এবং ২০২৪ সালে ৩৭৬৮ জন ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগী জেলায় শনাক্ত হয়।
ম্যালেরিয়াপ্রবণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শওকত আকবর খান। তিনি বলেন, ‘ম্যালেরিয়া নির্মূলে প্রান্তিক অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারিভাবে সমন্বিত বিশেষ কাজ করতে হবে। রাতে মশারি ব্যবহার করা, ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখা, সকাল ও সন্ধ্যায় মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারলেই ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।’
গত বছরের তুলনায় এবার ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধিতে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানান সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা। তিনি বলেন, ‘সাধারণত এই সময় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ একটু বাড়ে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। আমাদের মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম চলমান আছে। আমাদের নির্দেশনা রয়েছে, ম্যালেরিয়া সন্দেহ হলেই প্রত্যেককে যেন পরীক্ষা করানো হয়।’