চট্টগ্রাম শহরের পাঁচলাইশ থানাধীন চশমা পাহাড় আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে একটু এগোলেই বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) পাহাড় ঘেঁষে একটি মসজিদ। মসজিদের পাশ দিয়ে ওপরে উঠতেই চোখে পড়ে বেশ কয়েকটি কাঁচা বসতঘর। ওই বসতঘরের পাশ দিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে গেছে সরু পথ। বালির বস্তা বসিয়ে বানানো ওই পথ দিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে চোখে পড়ে মোবাশ্বিরা জাহান ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। গত ৪ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার দিকে সেখানে গেলে মাদ্রাসাটি তালাবদ্ধ দেখা যায়। শিশুদের জন্য ফোরকানিয়া মাদ্রাসা নির্মাণ করা হলেও বাস্তবে পথটিশিশুদের চলাচলের উপযোগী নয়। ঝুঁকিপূর্ণ এই পথে যেকোন মুহূর্তে পা পিছলে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। আশপাশের লোকজন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী আছে কী নেই, কিছুই বলতে পারেননি।
তবে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, মূলত পাহাড় কাটার জন্যই মাদ্রাসার সাইনবোর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। পাহাড়ের চূড়া কেটে মাদ্রাসাটি নির্মাণ করেছেন কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মামুন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিএফআরআইয়ের পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ছোট ছোট কলোনি গড়ে উঠেছে। একেকটি কলোনিতে কয়েকটি পরিবার বসবাস করে। তারাই ধীরে ধীরে পাহাড় কাটে। পাহাড়ের পাদদেশ বা নিচের অংশ এমনভাবে কেটে দেওয়া হয় যাতে বর্ষাকালে একটু ভারী বৃষ্টি হলেই তা ধসে পড়ে। এভাবে বিএফআরআইয়ের পাহাড়টি ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, পাহাড়টি শহরের প্রাণকেন্দ্রে হওয়ায় এর প্রতি অনেকের লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে। অনেকেই এটি দখল করে বসতঘর নির্মাণ করতে চান। নিম্ন আয়ের লোকজন এখানে বসবাস করে সহজেই কাজে যেতে পারেন। অনেক কম খরচে তারা তাদের কর্মস্থলে যাতায়াত করতে পারেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএফআরআই প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাহাড়ের চারপাশে অবৈধ দখলদারের উৎপাত শুরু হয়। ক্রমান্বয়ে পাহাড়ের চারপাশে বহুতল ভবনের সংখ্যা বাড়ছে। পাহাড় কেটে বহুতল নির্মাণের জন্য অনেক ডেভেলপার কোম্পানি যেমন আছে, তেমনি আছেন সাবেক মন্ত্রী-এমপির আত্মীয়স্বজনও। অতীতে দেখা গেছে, বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাহাড় ধ্বংসের সঙ্গে সংস্থাটির কতিপয় কর্মকর্তাও জড়িত ছিলেন। এদের অনেকেই অবসরে গেছেন। এ কারণে নির্বিঘ্নে পাহাড় কেটে বসতঘর নির্মাণ করতে পেরেছে অবৈধ দখলদাররা। ৫ আগস্টের পর দেশের অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। অনেক রাজনৈতিক নেতা দেশ ছেড়েছেন। কেউ আত্মগোপনে চলে গেছেন। কিন্তু বিএফআরআইয়ের পাহাড়ের অবৈধ দখলদাররা এখনো বহাল তবিয়তে। অতীতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের অনেক কর্মী পাহাড় কেটে অবৈধ বসতঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছিলেন। তারা এখন বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর সঙ্গে মিলে সেই দখল বজায় রেখেছেন।
জানতে চাইলে বিএফআরআইয়ের পাবলিসিটি অফিসার ইয়াকুব আলী খবরের কাগজকে বলেন, ৫ আগস্টের পর বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাহাড় কেউ নতুন করে দখল করেননি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাহাড় কেটে ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, বসতঘরসহ যেসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল তা পুনরুদ্ধারের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সঙ্গে মৌখিকভাবে পরামর্শ করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
বন গবেষণা ইনস্টিটিউট
বিএফআরই বাংলাদেশের বন গবেষণাবিষয়ক একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং এর প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামের ষোলশহরে অবস্থিত। ২৯ হেক্টর পাহাড়ের ওপর ১৯৫৫ সালে ‘ফরেস্ট প্রোডাক্ট ল্যাবরেটরি’ নামে এর যাত্রা শুরু হয় এবং এটি বনজ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কার্যক্রম বন ব্যবস্থাপনা উইং ও বনজ সম্পদ উইংয়ের অধীনে ১৭টি গবেষণা বিভাগ, একটি শাখা ও একটি কেন্দ্রের আওতায় পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির মূল কাজ বনজ সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধি, বনজ সম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নত পদ্ধতি উদ্ভাবন, বনজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গবেষণা এবং বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা।