১৬ বছরের তরুণীর ঘরে ৫৭ বছরের এক প্রবাসী আটক হয়ে এক রাত এক দিন থাকার পর সাড়ে তিন লাখ টাকায় করা হয় রফাদফা। সে টাকার মাত্র এক লাখ ২০ হাজার টাকা পেয়েছে ভুক্তভোগী। বাকি টাকা জনপ্রতিনিধি, মাতবর ও নেতাদের পকেটে।
এ অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবার। টাকা ভাগ-বাটোয়ার কথা স্বীকারও করেন জনপ্রতিনিধিসহ একাধিক নেতা।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা ঘটেছে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সীমান্তবর্তী পশ্চিম শিংঝাড় এলাকায়।
স্থানীয়রা জানান, নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জ ইউনিয়নের রায়গঞ্জ বাজার এলাকার বাসিন্দা আকরামুল হক রানুকে (৫৭) বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে ভুরুঙ্গামারী উপজেলার জয়মনির হাট ইউনিয়নের পশ্চিম শিংঝাড় এলাকার ওই তরুণীর ঘরে আটক করেন এলাকাবাসী। ওই তরুণী এবার জয়মনির হাটের বাউশমারী ফাজিল মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে রায়গঞ্জ বাজারের পাশের বাসিন্দা রানু দীর্ঘদিন দুবাইতে ছিলেন। আগে দুটি বিয়ে করেছেন। দুই সন্তান রেখে প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিলে রানুর বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা করেন তিনি। মামলা চলা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার করছেন। সেখানে এক সন্তান।
স্থানীয় অনেকে জানান, রানুর মাদক সেবনের অভ্যাস থাকায় প্রায়ই মাদক সেবন করতে সীমান্ত এলাকায় যান। ওই মেয়ের বাড়ি সীমান্ত এলাকায়। প্রায়ই সেখানেও যেতেন।
জানা গেছে, রাতে আটকের পর রায়গঞ্জ এলাকার বেশ কিছু লোকজনসহ জয়মনিরহাট ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড সদস্য (মেম্বার) আনোয়ার হোসেনসহ স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে রানুকে উদ্ধার করতে গেলে এলাকাবাসী বিয়ের দাবি জানান। সারারাত ও শুক্রবার দিনভর ভুক্তভোগী তরুণী বিয়ের দাবিতে অনড় থাকে। পরে শুক্রবার সন্ধ্যায় জয়মনিরহাট ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা বাদল তালুকদার, চার ইউপি সদস্যসহ স্থানীয় নেতা-কর্মী ও মাতবর মিলে সাড়ে তিন লাখ টাকায় বিষয়টির রফাদফা করেন।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ওই টাকার মধ্যে ভুক্তভোগী তরুণীর পরিবার পেয়েছে মাত্র এক লাখ ২০ হাজার টাকা। বাকি টাকা ভাগ-বাটোয়ারার করা হয়েছে।
টাকা ভাগের কথা স্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টরা। তবে তাদের দাবি মেয়ের পরিবারের হাতে দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী তরুণীর ভাই বলেন, 'টাকা দিছিল ওসমান (যুবদল নেতা) আর একজনসহ ২০ টাকা নিল- বলল, অনেকে আছে। মেম্বার, চেয়ারম্যানে ছিল। ওরা নিছে। আরও কিছু ছেলে ছিল ওরাও নিছে। হারুন, গোলাম, রেজাউল, রন্জু, আতা আরও অনেকে ছিল। এক লাখ ২০ হাজার টাকা পাইছি।
ভুক্তভোগীর মা বলেন, 'তারা রাত জাগছে। এহানে ছিল। তাই তারা টাকা নিছে। যদিও ভুরুঙ্গামারী ইউনিয়ন যুবদল সভাপতি পরিচয় দিয়ে ওসমান বলেন, আমি ছিলাম। টাকা নেইনি। ওরা মিথ্যা বলেছে।
সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, 'মেয়েটার সঙ্গে লোকটার দুই বছর সম্পর্ক আছিল। আটকের পর সারারাত ছিলাম। ওরা বিয়া দিব। শুক্রবার চেষ্টার পর ফয়সালা করে দিছি। বাদল ভাই আছিল। টাকা ভাগের বিষয়ে বলেন- না, না। ওদের দুই লাকই (লাখ) দেওয়া হইছিল।
সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা বাদল তালুকদার বলেন, তার দুই বউ, বাচ্চা আছে। তারপরে তো বিয়ে দেওয়া যায় না।
মেয়েটা তো ছোট। কীভাবে মীমাংসা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
বাকি দেড় লাখ? এর উত্তরে তিনি বলেন- ওখানে চারজন ইউপি সদস্য ছিল। নেতা-কর্মী ছিল। অনেক লোকজন ছিল। বোঝেনইতো।
এ বিষয়ে আকরামুল হক রানু বলেন, 'আমি ট্র্যাপে পড়েছি। এটা নিয়ে পড়ে কথা বলব।'
রায়গঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান দীপ মন্ডল বলেন, 'এটা জঘন্য কাজ করেছে। পরবর্তীতে কি হয়েছে তা জানি না। আমি ঢাকায়।'
জয়মনির হাট ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, 'আমাদের সাবেক চেয়ারম্যান বাদল ভাই ছিল। চারজন ইউপি সদস্য ছিল। সবার উপস্থিতিতে মীমাংসা হয়েছে। সাড়ে ৩ লাখ টাকার কথাটা জানি। এ বেশি কিছু জানি না। কারণ, আমি উপস্থিত ছিলাম না।'
মেহেদী/