ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে এখন কেবলই উৎকণ্ঠা আর জীবন বাঁচানোর লড়াই। গত তিন মাসে দুই হাজারেরও বেশি শিশু আক্রান্ত ও ৪৯ জনের মৃত্যু পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলেছে। শয্যাসংকটে মেঝেতে ঠাঁই হওয়া অসুস্থ শিশুদের কষ্ট আর স্বজনদের নিরন্তর অপেক্ষা যেন এক নীরব স্বাস্থ্যসংকটের প্রতিচ্ছবি। আইসিইউহীন এই লড়াইয়ে চিকিৎসকদের নিরলস চেষ্টা সত্ত্বেও বাড়ছে উদ্বেগ।
গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়া হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন শিশু ভর্তি হওয়ায় হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে বাড়ছে চাপ।
সরেজমিন ঘুরে ওয়ার্ডের প্রতিটি কোণেই অসহায়ত্বের দৃশ্য চোখে পড়ে। অনেক শিশুর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, কারও উচ্চ জ্বর, পাশাপাশি ভুগছে নিউমোনিয়ায়, কারও আবার তীব্র শ্বাসকষ্ট। নির্ধারিত শয্যাসংকটের কারণে অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। সন্তানের মাথার পাশে বসে থাকা মায়েদের চোখে ঘুম নেই, বাবাদের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে আসা সাবিনা ইয়াসমিন মুক্তা জানান, সম্প্রতি তার আট মাস বয়সের শিশু মেয়ে রাইসা তাবাসসুমের শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার পর স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়া হয়েছিল। সাময়িকভাবে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়। তবে পরে আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেলে আনা হয়। এখন সাবিনা ইয়াসমিন শুধু অপেক্ষা করছেন সন্তানের সুস্থতার সংবাদ শোনার জন্য।
একই ধরনের উদ্বেগে দিন কাটছে ময়মনসিংহ সদর এলাকার বহু পরিবারের। কেউ হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত, কেউ আবার হৃদরোগজনিত জটিলতায় ভুগছে। অনেক ক্ষেত্রে একই পরিবারের একাধিক শিশু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। এতে শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, পরিবারগুলোকে পড়তে হচ্ছে চরম মানসিক ও আর্থিক সংকটে।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দাপুনিয়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম। তার তিন শিশু ও দুই আপন ভাতিজা হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি আছে।
আব্দুল করিম বলেন, ‘আমার ১৩ বছরের মেয়ে সাদিয়া আক্তার, দুই বছরের ছেলে রাফসান ও ৪ মাস বয়সের আরেক মেয়ে সাইফা আক্তার হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে। এ ছাড়া আমার ৫ বছর বয়সের ভাতিজা জুবায়েদ ও ৩ মাস বয়সের আরেক ভাতিজা আয়ানকে ভর্তি করা হয়েছে। সবাই হামের উপসর্গের পাশাপাশি শাসকষ্ট, জ্বর, কাশি ও পাতলা পায়খানায় ভুগছে। শিশুদের নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র বলছে, গত ১৭ মার্চ থেকে ১২ জুন সকাল পর্যন্ত (প্রায় তিন মাস) হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২ হাজার ৪৩ শিশু ভর্তি হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ৪৯ শিশুর মৃত্যু পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
চিকিৎসকরা জানান, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে টিকাপ্রাপ্ত ও টিকাবিহীন–দুই শ্রেণির শিশু রয়েছে। তবে অপুষ্টি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা ও দেরিতে হাসপাতালে আনার কারণে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা মারাত্মক আকার ধারণ করছে। সংক্রমণ মোকাবিলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে একটি বিশেষ হাম কর্নার চালু করে। পরে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়। বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত তিনটি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে শিশুদের জন্য পূর্ণাঙ্গ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) না থাকা। গুরুতর শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিকল্পব্যবস্থা হিসেবে বাবল সিপ্যাপ প্রযুক্তির মাধ্যমে অক্সিজেন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল নিশ্চিত করা গেলে শিশুদের জন্য আইসিইউ চালু করা সম্ভব হবে, যা সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম মেডিকেল দলের ফোকালপারসন সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, সময়মতো এমআর টিকা গ্রহণ, অবিভাবকদের সচেতনতা, আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা ও দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে হামের অধিকাংশ জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ ছাড়া জটিল অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আগেই শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান বলেন, ‘আক্রান্ত শিশুদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। রোগীর চাপ অনেক বেশি হলেও চিকিৎসকরা সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন।’