জীবন বাঁচাতে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা চরম মানবিক সংকটে পড়েছেন। রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ইউথ কংগ্রেস রোহিঙ্গা’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নিবন্ধন না হওয়ায় নতুনরা প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য পাচ্ছেন না। ফলে তারা ক্যাম্পে থাকা স্বজনদের ওপর নির্ভর করছেন। তবে আন্তর্জাতিক তহবিল কাটছাঁটের কারণে সামগ্রিক ত্রাণ ও চিকিৎসাসামগ্রী কমে যাওয়ায় ১০ লাখের বেশি মানুষের এই মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাটি এখন ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
‘ইউথ কংগ্রেস রোহিঙ্গা’ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত একটি রোহিঙ্গা যুব সংগঠন। এই সংস্থাটি মূলত শরণার্থী ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গা তরুণদের ক্ষমতায়ন এবং মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করে।
গত বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত সেমিনারে ‘ফ্রম অ্যারাইভাল টু সারভাইভাল: কন্ডিশনস অব নিউলি অ্যারাইভাল রোহিঙ্গা রিফিউজিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘ইউথ কংগ্রেস রোহিঙ্গা’ এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ফরটিফাই রাইটস’-এর সহায়তায় তারা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। সেমিনারে আঞ্চলিক গবেষক, মানবাধিকার কর্মী ও ‘ফর্টিফাই রাইটস’-এর আইনি বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে ফর্টিফাই রাইটসের পরিচালক পুত্তানি কাংকুন প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন।
বিদেশি সংস্থাগুলোর তৈরি করা গতানুগতিক প্রতিবেদনের বাইরে গিয়ে এই প্রতিবেদনে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোর বাস্তব চিত্র এবং সেখানে থাকা রোহিঙ্গাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সবচেয়ে বেশি প্রধান্য দেওয়া হয়েছে।
‘ইউথ কংগ্রেস রোহিঙ্গা’র স্বেচ্ছাসেবী গবেষণা উপদেষ্টা হ্যালি রিটসেমা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সব সময় অন্যরা রোহিঙ্গাদের পক্ষে এবং রোহিঙ্গাদের নিয়ে কথা বলে। কিন্তু প্রায়ই এই আলোচনাগুলো থেকে রোহিঙ্গাদেরই বাদ দেওয়া হয়।’
তিনি জানান, সম্প্রতি আসা নতুন শরণার্থীরা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পাওয়ায় সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে তারা জীবনধারণের জন্য পুরোপুরি ক্যাম্পে আগে থেকে থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের ব্যক্তিগত সহায়তার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে আন্তর্জাতিক তহবিল কাটছাঁটের কারণে ক্যাম্পে আগে থেকে থাকা রোহিঙ্গাদের নিজেদেরই রেশন ও চিকিৎসাসামগ্রী কমে গেছে। ফলে নতুনদের সাহায্য করার এই অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটি এখন ভেঙে পড়ার মুখে পড়েছে।
সেমিনারে আলোচকরা সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নতুন শরণার্থীদের নিবন্ধনের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকায় এই সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে নীতিগত পরিবর্তন না আনলে নতুন আসা এই বিশাল জনগোষ্ঠী চরম দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের মুখে পড়বে।
ফর্টিফাই রাইটসের অপর পরিচালক জন কুইনলি বলেন, ‘বাংলাদেশে যে নতুন শরণার্থীরা আসছেন, তাদের সহজে নিবন্ধন করার এবং সেবা পাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।’ বিশ্বজুড়ে দাতাদের আর্থিক সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ১০ লাখের বেশি মানুষকে টিকিয়ে রাখা মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাটি এখন ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘মানবিক সহায়তা ছাড়া শরণার্থীরা ক্যাম্পে বেঁচে থাকতে পারবে না।’ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী উভয় পক্ষকেই জরুরি ভিত্তিতে তহবিল বাড়ানোর আহ্বান জানান।
গবেষকদের মতে, এই সংকটকে কেবল সীমান্ত সুরক্ষার একটি সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখলে ভবিষ্যতে আরও বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটবে। ‘ইউথ কংগ্রেস রোহিঙ্গা’ ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো নতুন আসা পরিবারগুলোর জন্য আইনি সুরক্ষা ও জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক সরকার ও আন্তর্জাতিক দাতাদের দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
তারা জোর দিয়ে বলেন, মায়ানমারের ভেতরে রোহিঙ্গাদের ওপর চলা সামরিক সহিংসতা, নাগরিকত্বের অভাব এবং বাস্তুচ্যুতির মতো মূল সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান না করা পর্যন্ত এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।
সূত্র: ডেমোক্রেটিক ভয়েস অব বার্মা