নাটোরের সিংড়া উপজেলার উত্তর দমদমা এলাকার সাড়ে তিন বছর বয়সী শিশুর মা, গৃহবধূ মুক্তানুর রহমান মুক্তা। পারিবারিক নানা ঘটনা আর মারামারির জেরে তিনি স্বামীর বিরুদ্ধে আদালতে মোহরানা মামলা করেছেন। ওই মামলায় স্বামী পলাতক। এদিকে অবুঝ সন্তানকে নানা-নানীর কাছে রেখে দ্বিতীয় স্বামীর সংসারে পাড়ি জমিয়েছেন ওই নারী। প্রথম স্বামী ও স্বজনদের দাবি, অবুঝ সন্তানের কথা না ভেবে এমনকি স্বামীকে তালাক না দিয়েই দ্বিতীয় সংসার শুরু করেছেন ওই নারী। নানা-নানীও এখন ওই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে যাওয়ার জন্য খবর পাঠানোয় বেকায়দায় পড়েছেন শিশুর বাবা ও দাদা-দাদী।
তথ্যমতে, ওই এলাকার আফাজ উদ্দীন মেহরী ৫ ছেলে, ২ মেয়ে ও স্ত্রী রেখে পরপারে পারি জমান। মৃত্যুর আগে শখ করে বড় ছেলে গোলাম মোস্তফার বড় সন্তান তারিকুল ইসলাম তারেকের সঙ্গে অপর ছেলে মুনসুর মোহরীর মেয়েকে বিয়ে দেন। বিয়ের সময় তারিকুলকে ১০ কাঠা জমি দিতে চাইলেও ওই জমি পায়নি তারিকুল। এদিকে পৈতৃক জমি বণ্টন নামাও হয়নি। মুনসুরের কাছে দলিলাদি থাকায় বার বার অংশ বুঝে নিতে চাইলেও মোস্তফাকে অংশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তবে কিছু জমি চাষাবাদ করে ভোগ দখলে দেওয়া হয়েছে মোস্তফাকে। ওই নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে মোস্তফাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় মুনসুররা।
পরে পাশের এক জমিতে বসবাস করতে থাকে মোস্তফা-তারিকুলরা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের শেষদিকে তকাতর্কির জেরে মেস্তফা ও তার স্ত্রীকে মারপিট করে মুনসুর। বিষয়টি জানতে পেরে পরের দিন সন্ধ্যায় তারিকুল তার শ্বশুর মুনসুরের কাছে গেলে তাকেও মারপিট করে মুনসুর। বিষয়টি জানতে পেরে তারিকুলের ছোট ভাই আলীফ ছুটে গিয়ে মুনসুরকে আক্রমণ করে। দুই ভাইয়ের মারপিটে মুনসুরের মাথাসহ শরীরে রতাক্ত জখম হয়। স্বজনরা মুনসুরকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করালে সপরিবারে তারিকুলরা আত্মগোপন করে। ওই ঘটনায় তারিকুল, আলীফ ও তার দুই মামাসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার নথি জমা দেয় মুনসুর। ঘটনার পর থেকে তারিকুলের স্ত্রী ও আড়াই বছরের ছেলে নুর মেহাম্মদ মুনসুরের বাড়িতে অবস্থান নেয়।
এদিকে ওই ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর আদালতে মোহরানা মামলা করো গৃহবধূ মুক্তা। আদালত শুনানি শেষে কাবিনে উল্লেখিত ৫ লাখ টাকা মোহরানা থেকে নগদ দেওয়া দেড় লাখ টাকা বাদে সাড়ে তিন লাখ টাকা জমা দিতে বলে তারিকুলকে। পরে আদালত নির্দেশিত প্রথম মাসের কিস্তি ২০ হাজার টাকা জমা দিলেও পরের কিস্তিগুলো দিতে না পারায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। এর পর থেকেই পলাতক রয়েছেন তারিকুল।
তারিকুলের স্বজনদের দাবি, প্রায় ১ মাস আগে গৃহবধূ মুক্তা তার প্রায় সাড়ে তিন বছর বয়সী ছেলে নুর মেহাম্মদকে নানা-নানীর কাছে রেখো সিংড়া উপজেলার রামানন্দ-খাজুরা ইউনিয়নের ভোগা গ্রামের গোলাম মিয়ার ছেলে ওমর ফারুকের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করে সংসার করছে। তারা উভয়ে এখন ঢাকায় বসবাস করছেন। প্রায় দুই-তিন বছর থেকে তাদের পরকীয়া চলছিল এমন দাবি তাদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওমর ফারুকের বাবা গোলাম মিয়া জানান, তার ছেলে ঢাকায় ব্যাটারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। প্রায় এক মাস আগে ওই বিয়ের কথা শুনেছেন। তবে ওই বিষয়ে ছেলের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তার বাবা মুনসুর মোহরী কোনো মন্তব্য করতে রাজী না হলেও জানান, গত ১৫-২০ দিন থেকে মুক্তা তাদের বাড়িতে নেই।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ওমর ফারুকের ঘনিষ্ঠ জামাল উদ্দীন জানান, সম্প্রতি ওই বিষয়ে ওমর ফারুকের সঙ্গে ফোনে কথা হলে সে বিয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও জানায়, মুক্তা এখনও তারিকুলকে ডিভোর্স দেয়নি। তবে ব্যাক ডেটে ডিভোর্স দেওয়া যায় কি-না তার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
তারিকুলের বাবা গোলাম মোস্তফার দাবি, বাবা মারা যাওয়ার সময় ৩২ বিঘা জমি রেখে গেছেন। তার বাবার অসুস্থতার সুযোগে মুনসুর বেশ কয়েক বিঘা জমি লিখে নিয়েছে। তিনি সাড়ে ৫ বিঘার মতো জমি পাওনা হলেও দেওয়া হয়েছে মাত্র সোয়া বিঘা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুনসুর জানান, তার বাবা সাড়ে ১০ বিঘা জমি রেখে গেছেন। মেস্তফাকে তিন বিঘা জমি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলাম আযম জানান, পারিবারিক জমি সংক্রান্ত ঝামেলা দীর্ঘদিন মুনসুর ধরে রাখার জেরে মুক্তা-তারিকুলের দ্বন্দ্ব। এরই জেরে ওই মামলা। তবে মামলা চলা অবস্থায় ডিভোর্স না দিয়েই অন্য ছেলের সঙ্গে মুক্তার সংসার গড়া আইনসিদ্ধ নয়। এমন সিদ্ধান্তে ছোট্ট অবুঝ শিশুটি এতিম হলো যার দায় মুক্তা বা মুনসুর এড়াতে পারে না।
তারিকুলের মামা মেহেদী বাবুর দাবি, রিকুলের বাবা বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ছোট ভাই আলিফ ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এমন অবস্থায় আদালতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় তারিকুল পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বিধায় পরিবারের সদস্যরা অনাহার-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন। এর ওপর মুক্তার দ্বিতীয় সংসার গড়ায় মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে তারিকুল। পাশাপাশি শিশু সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।
কামাল মৃধা/মাহফুজ