জনবল নেই। তাই থমকে আছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষালয়ের কার্যক্রম। ২০২১ সালের পর থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পাঠদানসহ সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আধুনিক অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেবল জনবলের অভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। ফলে জেলার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানটির তিনজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ৪ বছর ধরে ছুটিতে রয়েছে।
এদিকে দ্রুত জনবল নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আবারও চালু করা দাবি জানান শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। তবে জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বলছেন, প্রশিক্ষিত জনবল সংকট নিরসন করা গেলেই আবারও শুরু হবে জেলার একমাত্র সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের শিক্ষালয়টির কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার পুরাতন বাজারের কামাল উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি ভবনে চলছিল এর কার্যক্রম। প্রয়োজনীয় আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নের পর জেলা শহরের স্বরূপনগর অর্থাৎ সরকারি শিশু পরিবারসংলগ্ন এলাকায় শিক্ষালয়টি স্থানান্তরিত হয়। প্রতিষ্ঠানে ব্রেইল পদ্ধতির মাধ্যমে ১০ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষালাভের সুযোগ রাখা হয়। প্রতিষ্ঠানে প্রত্যেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু প্রথম শ্রেণি থেকে এসএসসি (মাধ্যমিক) স্তর পর্যন্ত পাঠদান করার সুযোগ পায়। জেলা পর্যায়ে এসব কার্যক্রমের দেখভাল করে সমাজসেবা অধিদপ্তর।
সরকারিভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্রেইল বই এবং অন্যান্য সহায়ক শিক্ষা উপকরণ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়।
তাদের শিক্ষাদানের তদারকি করেন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রিসোর্স শিক্ষক। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়াসহ সম্পূর্ণ হোস্টেল সুবিধা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার বহন করা হয় সরকারিভাবেই। শিক্ষার পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে তারা সমাজে স্বাবলম্বী হয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অথচ প্রায় ৪ বছর ধরে জনবলের অভাবে শিক্ষালয়টির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সেসব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা।
জেলা সমাজসেবা অফিসসূত্রে জানা গেছে, শিক্ষালয়টিতে মঞ্জুরি পদের সংখ্যা ৪টি। একজন পূর্ণ শিক্ষক থাকলেও বাকিরা হাউস প্যারেন্ট কাম টিচার। অফিস সহায়ক ও নৈশ্যপ্রহরীর পদ শূন্য আছে। শিক্ষালয়টিতে আউট সোর্সিংয়ে একজন রাঁধুনি আছেন। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী না থাকায় তিনি এখন সরকারি শিশু পরিবারে কর্মরত আছেন।
সূত্রটি জানায়, ২০১৯ সালের জুন মাসে তিনজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে ওই শিশুদের অভিভাবকরা ২০২১ সালের ২১ নভেম্বর তাদের বাড়ি নিয়ে যান। এর পর থেকেই শিক্ষালয়টিতে তালা ঝুলছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শহরের স্বরূপনগর এলাকায় তিনটি সরকারি অফিসের পাশে অবস্থান করা শিক্ষালয়টি বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দরজায় তালা ঝুলছে। তবে একই সঙ্গে সেখানে জাতীয় পতাকা তোলা আছে। এ সময় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষালয়টি প্রথম থেকে বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। সেখানে কোনো শিক্ষার্থী দেখতে পাননি তারা।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মুশফিকুল হাসনাত সিয়ামের নানি সায়েমা খাতুন বলেন, ‘জনবল না থাকার কারণে আমার নাতিকে সেখান থেকে বাড়িতে নিয়ে এসেছি। আবার নিয়োগ হলে নাতিকে পাঠিয়ে দেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই শিক্ষালয়টির কার্যক্রমটি চালু করার জন্য আমি অনেকের কাছে গিয়েছি। কিন্তু কোনো সুফল মেলেনি। প্রতিষ্ঠানটি চালু হলে তাদের জীবনের আলো ফিরে পাবে।’
এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে কুলসুম বলেন, ‘দক্ষ জনবলের অভাবে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা কার্যক্রমটি বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে তিনজন শিক্ষার্থী ভর্তি ছিল। তাদের দেখভালের জন্য কেউ নেই। সে জন্য অভিভাবকরা তাদের বাড়ি নিয়ে গেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। কয়েক দফায় প্রতিষ্ঠানটির জনবলের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে তথ্যও চেয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে খুব শিগগিরই শিক্ষালয়টির কার্যক্রম আবার শুরু করা সম্ভব হবে।’