দীর্ঘ সাত-আট বছর ধরে হরগজ ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ঝালমুড়ি, চানাচুর ও ছোলা-বুট বিক্রি করতেন মোহাম্মদ ফজলুর রহমান। একটি আচ্ছাদিত ভ্যানের স্বপ্ন তার বহুদিনের। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি কখনো। টেবিলের ওপর খাবার সাজিয়ে বিক্রি করতেন তিনি। চেষ্টা করতেন ধুলোবালি যেন না পড়ে, মাছি যেন না বসে। তবু খোলা আকাশের নিচে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাবার বিক্রি করা ছিল কঠিন।
আজ তার সেই কষ্টে মোড়া জীবনে এসেছে নতুন আলো। হাতে পেয়েছেন একটি আচ্ছাদিত ভ্যান। এখন তিনি শুধু দোকানদার নন; একজন গর্বিত উদ্যোক্তা।
‘আগে খোলা অবস্থায় বিক্রি করতে হতো, খাবার নষ্ট হতো, ক্রেতারাও অনেক এই অবস্থা দেখে চলে যেতেন। এখন এই ভ্যানটা পেয়ে আমি নিশ্চিন্তে বিক্রি করতে পারব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে’- বললেন ফজলুর রহমান।
ফজলুর রহমানের মতোই গল্প উপজেলার হরগজ গ্রামের মো. তজিম উদ্দিনের। তিনি সাটুরিয়া বাজারের পাশে রাস্তার ধারে দীর্ঘ দিন ধরে চপ ও পিঁয়াজু বিক্রি করেন। সাতজনের সংসার চালান এই ছোট ব্যবসার আয় দিয়েই।
তজিম উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিদিনই ধুলাবালিতে খাবার নষ্ট হয়ে যেত, ক্রেতারাও কমে যেত। ভ্যান কিনতে চাইলেও ৩০-৩৫ হাজার টাকা খরচ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আজ বিনামূল্যে একটি চারপাশে গ্লাস করা নতুন ভ্যান পেয়েছি। এখন এই ভ্যান ব্যবহার করে আমি শুধু বাজারেই নয়, বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল, মেলা, হাটবাজারেও আমার খাবার বিক্রি করতে পারব। বিক্রি বাড়লে সংসারে একটু স্বস্তি আসবে।’
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার হরগজ, সদর ও ফুকুরহাটি ইউনিয়নের আটজন অসহায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর হাতে বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হয় আটটি আচ্ছাদিত ভ্যান। বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি পরিচালনা করেছে বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান স্টেপ।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার চরসাটুরিয়া গ্রামে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উপকারভোগীদের হাতে এই ভ্যানগুলো তুলে দেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্টেপ এনজিওর নির্বাহী পরিচালক সঞ্জয় কুমার দাস বলেন, ‘আমরা দেখেছি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অনেকেই আর্থিক সমস্যার কারণে মানসম্মতভাবে খাবার বিক্রি করতে পারেন না। তাই বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের ‘আচ্ছাদিত রিকশা ভ্যান কর্মসূচি’র আওতায় আমরা সাটুরিয়ার তিন ইউনিয়নের আটজন ব্যবসায়ীকে বিনামূল্যে ভ্যান দিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, ‘এখন তারা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাবার বিক্রি করতে পারবেন, পাশাপাশি বিভিন্ন হাটবাজারে ও অনুষ্ঠানস্থলে বিক্রি করে অতিরিক্ত আয়ও করতে পারবেন। এটি তাদের জীবিকায় টেকসই পরিবর্তন আনবে।’
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘এই ধরনের আচ্ছাদিত ভ্যান বিতরণ কর্মসূচি শুধু একটি অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, এটি সামাজিক নিরাপত্তারও অংশ। যারা আগে খোলা জায়গায় ধুলাবালির মধ্যে খাবার বিক্রি করতেন, এখন তারা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ব্যবসা করতে পারছেন। এতে আয় বাড়বে, পরিবারে স্থিতিশীলতা আসবে, যা সামগ্রিকভাবে দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়তা করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই বেসরকারি সংস্থাগুলো সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের পরিপূরক হিসেবে এগিয়ে আসুক। তাহলেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে।’
অনুষ্ঠানে স্টেপ এনজিওর সভাপতি এএসএম ইউসুফ, সহকারী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলামসহ উপকারভোগীদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
আসাদ জামান/অমিয়/