ঢাকা বিভাগীয় খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র জমাদানে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আগ্রহী ঠিকাদারদের নারায়ণগঞ্জের একটি কমিউনিটি সেন্টারে ডেকে টেন্ডারসংশ্লিষ্ট কাগজ নিজেদের দখলে নিয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছে। আর এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ পেতে যাচ্ছে চট্টগ্রামের ৩০ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তারা ৩০৩টি ফরম কিনে এসব কাজ পাচ্ছে। ঠিকাদার সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র খবরের কাগজকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে কয়েকজন ঠিকাদার খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। এ ঘটনায় তিন সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
ঠিকাদার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১৭ বছর ধরে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদার খাদ্য অধিদপ্তরে প্রভাব খাটিয়েছেন। ‘সাধন চন্দ্র সিন্ডিকেট’ হিসেবে খ্যাত এসব ঠিকাদাররা চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ছড়ি ঘুরিয়েছেন। চট্টগ্রামের দুই সিএসডি খাদ্য গুদামসহ উপজেলার ১৬টি গুদাম, কক্সবাজার, সিলেট ও চট্টগ্রাম সাইলো, আশুগঞ্জ সাইলোর নিয়ন্ত্রণ এখনো পুরোনো সিন্ডিকেটের দখলে রয়েছে। সেই সিন্ডিকেট এবার ঢাকা বিভাগীয় খাদ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব খাটাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সাধারণ ঠিকাদাররা।
চট্টগ্রামের একাধিক খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার জানান, ঢাকা বিভাগীয় খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগে চট্টগ্রামের এক ঠিকাদার অন্তত ৩০টি ফরম জমা দিয়েছেন। শুধু ওই ঠিকাদারই নন, আরও দুটি সিন্ডিকেট পৃথকভাবে ২০ ও ৩০টি করে দরপত্র জমা দিয়েছে। তারা সিন্ডিকেটের কোটায় ভাগও পেয়েছেন। তবে সিন্ডিকেটের বাইরের ঠিকাদাররা কোনো কাজ পাচ্ছেন না। সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে কোন প্রতিষ্ঠান কয়টি কাজ পাবে।
ঢাকার খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০ বছর পর ঢাকা বিভাগীয় সড়ক পরিবহন ঠিকাদার (ডিআরটিসি) নিয়োগের টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। টেন্ডার ফরম জমাদানের শেষ দিন ছিল ২৬ অক্টোবর। ৮১৯টি ফরম বিক্রি হলেও জমা পড়ে ৭৮৪টি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টেন্ডার দাখিলের দুই দিন আগে ঢাকার পার্শ্ববর্তী নায়ারণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি কমিউনিটি সেন্টারে ফরম সংগ্রহকারী ঠিকাদারদের নিয়ে বৈঠক করা হয়। ঢাকা সমিতির নেতারা তখন সমঝোতার নামে সব দরপত্র হাতিয়ে নেন। এরপর তাদের মর্জিমাফিক দরপত্র দাখিল করেন। সারা দেশের সাধারণ ঠিকাদাররা তাদের হাতে জিম্মি ও অসহায় হয়ে পড়েন।
এদিকে টেন্ডার দাখিলে বাধা দেওয়ার ঘটনায় খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে চার ঠিকাদার অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে দাবি করা হয়, ২৪ অক্টোবর একটি কমিউনিটি সেন্টারে সব ঠিকাদারদের ডেকে ঢাকা সমিতির নেতারা সিডিউল ও আর্থিক প্রস্তাবের অংশ জমা নিয়ে নেন। খালি ফরমে সবার স্বাক্ষর নেন। ২৫০-৩০০ ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে বিপুল অঙ্কের লেনদেন হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পিপিআর অনুযায়ী ২৫০ থেকে ৩০০ জন ঠিকাদারের দরপত্রে দেওয়া দর আলাদা হওয়ার কথা। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানের দর প্রায় একই। এই একটি বিষয় তদন্ত করলেই অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খাদ্য বিভাগের এই সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী। মন্ত্রণালয়ের নাম ভাঙিয়ে তারা দীর্ঘবছর একচেটিয়ে ব্যবসা করেছিল। ৫ আগস্টের পর তাদের মধ্যে অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। তবে পুরোনো সেই সিন্ডিকেট নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে।
জানতে চাইলে ঢাকার খাদ্য পরিবহন ঠিকাদারদের নেতা আনছার আলী বলেন, ‘সমিতির কাছে থাকা আর্থিক ও যোগ্যতা প্রস্তাব উদ্ধারের যে অভিযোগ করা হচ্ছে তার জবাব চট্টগ্রামের নেতারা দিতে পারবেন। তবে দরপত্রে কোনো অনিয়মের ঘটনা ঘটেনি।’ ঢাকার আরেক নেতা মোহাম্মদ হারুনও একই কথা বলেন।
বক্তব্য জানতে কল করা হলে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। তবে অতিরিক্ত মহাপরিচালক জামাল হোসেন মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমরা অনিয়মের একটি অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করে দিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত আসবে।’
তিনি বলেন, ‘২০০৫ সালের পর থেকে নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ করা যায়নি। তারা (ঠিকাদার) মামলা করে আদালতের নির্দেশনা নিয়ে আসে। আমরা সেই নির্দেশনার বাইরে যেতে পারি না। এবার চেষ্টা করছি নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ঠিকাদার নিয়োগ করার।’