২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর। বাংলাদেশের উপকূলীয় দুর্যোগের ইতিহাসে এই দিনটি চিরস্থায়ী শোকের প্রতীক হয়ে আছে। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ সেই রাতে যে আঘাত হেনেছিল, ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও তার ক্ষতচিহ্ন মুছে যায়নি সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের হাজার হাজার মানুষের জীবন, জীবিকা ও মানসিকতা থেকে। দুর্বল ও ভঙ্গুর বেড়িবাঁধ, স্বজন হারানোর বেদনা এবং জীবিকার চরম অনিশ্চয়তা নিয়ে আজও স্থায়ী আতঙ্কের সমুদ্রে দিন গুনছেন এই জনপদের মানুষ। সিডরের সেই দুঃসহ স্মৃতি এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব উপকূলের চলমান সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে ২৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানা সুপার সাইক্লোন সিডর, যা স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল, এর তাণ্ডবে উপকূলীয় জনপদ পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ১৫ থেকে ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস বেড়িবাঁধ উপচে এবং ভেঙে লোকালয়ে প্রবেশ করে। ঘরবাড়ি, ফসল ও গবাদি পশু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বরগুনা, পটুয়াখালীসহ খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি, কালীগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রায় ৩ হাজার ৩৬৩ জন মানুষ প্রাণ হারান এবং প্রায় ৫৫ হাজার ২৮২ জন আহত হন। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল অভাবনীয়। প্রায় ৬ লাখ বসতঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় এবং আরও ১০ লাখ ঘর আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা এ অঞ্চলের জীবনযাত্রার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।
সিডরের এই আঘাত শুধু অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি আঘাত হেনেছিল উপকূলীয় মানুষের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ৪৩ বছর বয়সী বাসিন্দা সফুরা বেগম সেই রাতের বিভীষিকা আজও ভুলতে পারেননি। তার চোখের সামনে সারি সারি লাশ ভেসে ছিল। এ দৃশ্যের কথা মনে করে তিনি শিউরে ওঠেন।
তিনি জানান, ‘সেদিন সারি সারি লাশ চোখের সামনে ভেসে ছিল। দরজার সামনে, বাগানে কত লাশ যে পড়ে থাকতে দেখেছি তার হিসাব নেই। কাপড়ের অভাবে অনেক লাশ কোনোরকম পলিথিনে মুড়িয়ে দাফন করছে।’
কোলে দুধের বাচ্চা নিয়ে টানা চার দিন না খেয়ে থাকার সেই মর্মান্তিক স্মৃতি তিনি বহন করে চলেছেন। তিনি আক্ষেপ করেন, সিডরের পর থেকে ‘অভাব-অনটন-সংকট লেগেই আছে। দুঃখের আর শেষ হয় না।’
শ্যামনগরের কৃষক আবদুল করিমের স্মৃতিতেও সেই রাত বিভীষিকার মতো ফিরে আসে, ‘রাতে হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ল। ঘর ভেঙে গেল, গবাদিপশু আর ফসল সব তলিয়ে গেল... সেই রাতে বাচ্চাদের চিৎকার আর দেয়াল ভাঙার শব্দ আজও মনে পড়ে। সেই ভয় ভোলা যায় না।’
সিডরের অর্থনৈতিক অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রসারী। তালা উপজেলার সিডরে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা আজও চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করছেন। দুবলারচরে মাছ ধরতে গিয়ে প্রাণ হারানো অজিত হালদার ও গৌর হালদারের মতো স্বজনদের স্ত্রীরা মাছ বিক্রি এবং অন্যের বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের নিয়ে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন।
অজিত হালদারের স্ত্রী রিতা হালদার বলেন, ‘স্বামী হারানোর পরে দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে দিন কাটানো কঠিন। মাছ বিক্রি ও ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। ঋণ শোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’ গৌর হালদারের স্ত্রী আরতি হালদারের আক্ষেপ, বিপর্যয়ের এত বছর পরও তাদের খোঁজ কেউ রাখে না।
অসংখ্য মানুষের মাছের ঘের, ফসলি জমি সিডরের জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়, যার ফলে জীবিকার মূল উৎস হারান এখানকার চাষিরা। স্থানীয় কৃষিকর্তারা জানান, শ্যামনগর, আশাশুনি, কালীগঞ্জ ও বুড়িগোয়ালিনী এলাকায় ফসল উৎপাদন প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ কমে গিয়েছিল, যা আজও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি।
১৭ বছর পরও উপকূলের এই অঞ্চল স্থায়ী নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। গাবুরা জনপদজুড়ে এখনো বেশির ভাগ মানুষ ছোটখাটো খড়কুটো ও পাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি ভঙ্গুর ঘরে বসবাস করে। বাসিন্দারা সর্বদা আতঙ্কে থাকেন এই বুঝি আবার ঝড় এল, সবকিছু কেড়ে নিল! গাবুরার বাসিন্দা মহসিন গাজী বর্তমান দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘মাছ, কাঁকড়া আর মধু সংগ্রহ করেই সংসার চলে। অভাব-অনটনের শেষ নেই। তার ওপর জোয়ার এলেই বাঁধ ভেঙে যায়। পুকুরে নদীর পানি চলে আসে। খাওয়ার পানি থাকে না। বেশির ভাগ সময় কাদামাটিতে হাঁটতে হয়।’
তিনি আরও জানান, সামান্য চিকিৎসার জন্য নদী পার হয়ে উপজেলা সদরে যেতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বাড়তে থাকায় এই অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে বলে দাবি করলেও, স্থানীয়রা বলছেন, বাঁধের অনেক অংশ এখনো অরক্ষিত ও দুর্বল।
সাতক্ষীরার পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত সিডরকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘আগামীতে ঝড় আরও শক্তিশালী হতে পারে। যদি উপকূলীয় বাঁধ ও সতর্কতা ব্যবস্থা শক্ত না হয়, ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় আসবে।’
তার মতে, ‘সিডরের দুঃসহ স্মৃতি, দুর্বল টেকসই বেড়িবাঁধের অভাব এবং দারিদ্র্যের কষাঘাত– এই তিনের সম্মিলিত চাপ আজও সাতক্ষীরার উপকূলবাসীকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান এবং সর্বোপরি টেকসই ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।