নরসিংদী সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের গাবতলি এলাকায় গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নির্মাণাধীন ভবনের তিন তলায় রাখা ইট ও বিল্ডিংয়ের কার্নিশ ভেঙে পরে পুরো একটি পরিবারকে নিঃশেষ করে দিয়ে গেছে ভূমিকম্প।
সকালের নাস্তা খেয়ে সন্তানদের নিয়ে ঘরে অবস্থান করছিলেন দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বল (৩৮) ও তার ছোট ছেলে ওমর আলী (১০) ও বড় মেয়ে উষা (১৭) ও ছোট মেয়ে তুৎফা (১৪)। এর কিছু মূহূর্তের মধ্যে ভূমিকম্প টের পেয়ে তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে সন্তানদের নিয়ে বেরিয়ে পরেন উজ্জ্বল। ঘরের বাইরে বের হয়েও শেষ রক্ষা পেলেন না তারা। পাশের ছয় তলা নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের তিন তলায় রাখা ইট হেলে পড়ে পুরো পরিবারের উপর। মাথায় আস্ত ইট বৃষ্টির মতো উজ্জ্বল, ওমর, উষা, তুৎফার উপর এসে পরে। কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই বাবা-ছেলে মৃত্যুর পথে অনন্ত যাত্রা। তবে রক্ষা পান উজ্বলের দুই মেয়ে উষা ও তুৎফা।
ঘটনার সময় উজ্জলের স্ত্রী লূৎফা অবস্থান করছিলেন পাকুন্দিয়ায়। স্বামী সন্তানদের নরসিংদী রেখে লূৎফা ষাটোর্ধ বৃদ্ধ অসুস্থ শাশুড়িকে দেখতে এসেছিলেন। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) পাকুন্দিয়া থেকে দুপুর ১২টার দিকে নরসিংদীর ভাড়া বাসায় যাত্রার কথা ছিল লূৎফার। কিন্তু তার আগেই বাড়িতে আসে দূর্ঘটনার খবর। ওইদিন স্বামীর সঙ্গে শেষ দেখা বা কথা হয়নি লূৎফার।
স্বামী ও ছেলে সন্তানের শোকে নিস্তব্ধ হয়ে গেছেন লূৎফা। শোকে কাতর হয়ে কথাও বলতে পারছেন না লূৎফা বেগম। ঘরের ভেতর বিলাপ করছিলেন মা রেহেনা খাতুন। মৃত্যুর সময় পাশে না থাকতে পারার আফসোস জমিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। ছেলে ও নাতিকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে তাকিয়ে ছিলেন রেহেনা খাতুন। চোখে জমে ছিল হাজারো না বলা কথা আর দীর্ঘশ্বাস।
পরিবারের বটগাছের মতো ছায়া হয়ে ছিলেন দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বল। মৃত্যুর সংবাদ বাড়িতে পৌঁছার পর আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। তারা দেলোয়ারের বাড়িতে ভিড় করেন। শুক্রবার রাত সাড়ে ৩টায় মরদেহ আনা হয় গ্রামের বাড়ি পাকুন্দিয়ায়।
স্বজন ও এলাকাবাসী জানায়, ১০ বছর ধরে দেলোয়ার হোসেন নরসিংদীতে একটি জুট মিলে অফিস সহকারী পদে চাকরি করতেন। তিন বছর আগে পরিবারের সদস্যদের তিনি সেখানে নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় শুক্রবার সকালে সন্তানদের সঙ্গে বাসায় ছিলেন তিনি। বাড়িতে না থাকলেও এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ছিল উজ্জ্বলের। এলাকায় একজন ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিতি ছিল তার। চার বছর আগে মারা যান দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বলের বাবা। এরপর থেকে পরিবারের অভিভাবকের দায়িত্ব তিনিই পালন করতেন। উজ্জ্বলের এমন মৃত্যুতে সকল আত্মীয় স্বজনরা শোকে কাতর।
নিহতের ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার বড় ভাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নরসিংদীর গাবতলি এলাকায় ভাড়া থাকতো। চাকরির সুবাদে সেখানে আব্বা মারা যাওয়ার পর ভাবী আর ভাতিজা ও দুই ভাতিজিকে নিয়ে চলে গেছে। আমি ঢাকা ব্যাংকের ভৈরব শাখায় চাকরি করি। হঠাৎ ভাইয়ের এমন সংবাদ পেয়ে ছুটে যাই কিন্তু ভাইকে তো আর জীবিত পাইনি। মৃত্যু সত্যি তবে এমন মৃত্যু তো বেদনাদায়ক, বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। ভাইয়ের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন তিনি।
নিহতের মামাতো ভাই শামসুল ইসলাম জীবন খবরের কাগজকে বলেন, তার সংসারটা সে নিজের হাতে গুছিয়ে নিয়েছিল। ভূমিকম্পে সাজানো গোছানো সংসারটা শেষ হয়ে গেল। আমার ভাইয়ের মৃত্যুটা এভাবে না হয়ে স্বাভাবিকভাবে হইতে পারতো। এমন করুণ মৃত্যু আমাদের সবাইকে মর্মাহত করেছে। আমার ভাই ভাতিজাকে তো আর ফিরে পাব না। তবে তাদের এমন মৃত্যু আমরা কেউ মেনে নিতে পারছি না।
পাকুন্দিয়া ৪নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম খবরের কাগজকে বলেন, তাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক। যখনি এলাকায় আসতো আমার সঙ্গে দেখা না করে নরসিংদী যেতো না। এবারও উজ্জ্বল এসেছে তবে লাশ হয়ে। এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তা করতো সে। তার মতো মানুষের এভাবে মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না। আমরা সবাই মরব কিন্তু এভাবে মৃত্যুটা আমরা সইতে পারছি না।
কিশোরগঞ্জ-২ (পাকুন্দিয়া-কটিয়াদি) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দীন ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. বিল্লাল হোসেন শনিবার (২২ নভেম্বর) সকালে পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। এসময় তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে থাকার এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তার কথাও জানান। জানাজায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পিতা-পুত্রের লাশ পাশাপাশি দাফন করা হয়।
মাহফুজ/