পিরোজপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি ভবনে ভূমিকম্প আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কারণ বেশির ভাগ ভবনই ব্যবহারের অনুপযোগী। এর মধ্যে কোনো কোনোটি বহু বছর আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কোনোটি আবার চলছে জোড়াতালি দিয়ে। এমন অবস্থায় এসব ভবনে দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে রয়েছে সরকারি হাসপাতাল, পুরোনো কালেক্টরেট ভবন, মহিলা কলেজ ও টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মতো স্থাপনা। এসব ভবনের শিক্ষার্থী ও সেবাপ্রার্থীরা পড়েছেন বিপাকে। ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীদের সেখানে ক্লাস করতে হয়। হাসপাতালে আসা রোগীদের ভবন ভেঙে পড়ার আতঙ্ক নিয়েই চিকিৎসা নিতে হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে জেলায় উন্নীত হওয়া পিরোজপুর আগে ছিল মহকুমা, যা প্রায় ১৫০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে জেলা শহরে যে পুরোনো ভবনগুলো রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগের বয়স শত বছর পেরিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোনো সংস্কার না হওয়ায় অধিকাংশই ভবনই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পুরোনো ডিসি অফিসটি কালেক্টরেট ভবন নামে পরিচিত। বহু বছর আগে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তারপরও সেখানে দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড চলমান রয়েছে। দুটি সরকারি অফিস ও বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কক্ষ ভাড়া নিয়ে এখানে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। শহরের টাউন ক্লাব মার্কেটের অবস্থাও একই রকম। মহিলা কলেজের চারটি ভবন ও টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান ভবনটিও জরাজীর্ণ। এ ছাড়া শহরের ক্লাব সড়কের গোপাল কৃষ্ণ টাউন ক্লাব মার্কেটে থাকা দুটি ব্যাংকের শাখা ঝুঁকি বিবেচনায় ১০ বছর আগে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু ওই ভবনে এখনো একাধিক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, পিরোজপুর সরকারি মহিলা কলেজের তিনটি একাডেমিক ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একটি তিনতলা, একটি চারতলা ও একটি দোতলা ভবন। এ ছাড়া কলেজটির রয়েছে চারতলা একটি আবাসিক হল ভবন। তবে এগুলোর মধ্যে আবাসিক হলসহ কলেজের তিনটি ভবনের অবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। দেয়ালের রং উঠে গেছে, খসে পড়ছে পলেস্তারা। ফাটল দেখা দিয়েছে দেয়াল, ছাদ, পিলার ও বিমে। কিন্তু কোনো উপায় না থাকায় প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীদের এসব ভবনেই ক্লাস করতে হচ্ছে। ১ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার শিক্ষার্থীই এসব ভবনে ক্লাস করে। এ ছাড়া জেলায় ৯৮৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৮৫টি ভবনই মারাত্মক ঝুঁকিতে।
কথা হয় শহরের পুরোনো কালেক্টরেট ভবনের একটি অফিসের কর্মকর্তা মাইনুল আহসান মুন্নার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারি অফিসের পাশাপাশি এখানে একাধিক প্রতিষ্ঠানের ভাড়া নেওয়া কক্ষ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের ভূমিকম্পের পর থেকে আমরা খুবই আতঙ্কে আছি। আশা করছি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।’
শহরের ক্লাব সড়কের গোপাল কৃষ্ণ টাউন ক্লাব মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় একটি অফিসে বসেন নিয়াজ মোর্শেদ। তিনি বলেন, ‘এই ভবনটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আমরা এখানে ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছি। ভবনটি সংস্কারে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
পিরোজপুর সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী তাহমিনা হক বলেন, ‘কলেজের তিনটি একাডেমিক ভবন ও হোস্টেল ভবনটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ভূমিকম্পের পরে হোস্টেলের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে। খুব আতঙ্কের মধ্যে থাকছি। আমরা চাই, দ্রুত হোস্টেলটি সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করা হোক।’
এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) ফাহিম আহমেদ বলেন, ‘গণপূর্ত বিভাগ জেলায় সরকারি-বেসরকারি প্রায় ১ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করেছে। ভবনগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করার জন্য মন্ত্রণালয়ে তথ্য পাঠানো হবে।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আলাউদ্দীন ভূঞা জনী বলেছেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো আমরা পরীক্ষা করব। পুরোনো কালেক্টরেট ভবনটি মূলত স্যালভেজ (পুনরায় ব্যবহার) হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এখানে একটি স্কুল রয়েছে। সেখানে আমরা একটি ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করেছি। তবে যেগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, সেগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে।’