শতবর্ষী প্যাডেলচালিত স্টিমার ‘পিএস মাহসুদ’ বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে পুনরায় যাত্রা শুরু করেছে।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টায় কীর্তনখোলা নদীর তীরে ত্রিশগোডাউন এলাকার বিআইডব্লিউটিএর অস্থায়ী ঘাট থেকে ২০ যাত্রী নিয়ে জাহাজটি ঢাকার পথে রওনা হয়।
এর আগে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে এসে সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় স্টিমারটি একই ঘাটে নোঙর করে।
বিআইডব্লিউটিসি জানিয়েছে, স্টিমারটি ‘পর্যটক সার্ভিস’ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী দুপুর ২টার দিকে স্টিমারটি চাঁদপুরে পৌঁছাবে। আধাঘণ্টা বিরতির পর আবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবে। সন্ধ্যা ৬টার দিকে সদরঘাটে নোঙর করার কথা রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসির বরিশাল অফিসের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) জসিম উদ্দিন সিকদার বলেন, ‘গতকাল বরিশাল থেকে প্রথম, দ্বিতীয় ও সুলভ শ্রেণিতে মোট ২০ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেছে স্টিমার পিএস মাহসুদ। এর আগে শুক্রবার ঢাকা থেকে ৪১ জন যাত্রী নিয়ে রওনা দেয়। পথে চাঁদপুর ঘাটে নেমে যান ২১ যাত্রী, বাকি ২০ জন বরিশালে আসেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘দিনের যাত্রায় যাত্রীরা নদী ও নদীতীরবর্তী এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। শত বছরের এই স্টিমারগুলো আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। পর্যটকদের জন্য এটি আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।’
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মোড়লগঞ্জে আমাদের বাড়ি। স্টিমারের সঙ্গে ছোটবেলার অনেক স্মৃতি জড়ানো। এটি শুধু যাত্রা নয়, এক ধরনের অনুভূতি। প্রথম দিনের যাত্রায় পরিবারকে নিয়ে এসেছি। আধুনিক লঞ্চের সঙ্গে এর তুলনা চলে না। যারা নদী ভালোবাসেন, তাদের জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা। পর্যটনে স্থানীয় খাবার ও দর্শনীয় স্থানের ব্র্যান্ডিং জরুরি।’
আরেক যাত্রী সালাহউদ্দিন অকন বলেন, ‘দিনের আলোয় শতবর্ষী স্টিমারে ভ্রমণ ভিন্নরকম অভিজ্ঞতা। নিয়মিত সার্ভিস সম্ভব না হলেও এটি পর্যটনের সম্ভাবনা বাড়াবে।’
তিনি সময়সূচি ও রুট আরও সমন্বয়ের কথা এবং ভাড়া কিছুটা কমানোর প্রস্তাব দেন।
বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান বলেন, ‘পুরোনো স্টিমারের ইঞ্জিনের শক্তি আগের মতো নেই। ঢাকার সঙ্গে বরিশাল রুটে নিয়মিত চলাচল সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। সবকিছু বিবেচনায় রেখে সপ্তাহে দুই দিন ‘প্রমোদ তরী’ হিসেবে চলাচলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
শতবর্ষী স্টিমার পিএস মাহসুদে তিন শ্রেণির সিট রয়েছে:
দ্বৈত শয্যার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কেবিন ভাড়া ২,২৬০ টাকা (ভ্যাটসহ ২,৫৯০ টাকা); দ্বিতীয় শ্রেণির কেবিন ১,৬৫০ টাকা; সুলভ শ্রেণির চেয়ার ৬০০ টাকা। ঢাকা-চাঁদপুর ভাড়া যথাক্রমে ৭৮৩, ৫৬০ ও ১৪০ টাকা এবং চাঁদপুর-বরিশাল ভাড়া ১১৭৩, ৮৪০ ও ২৬০ টাকা।
পিএস মাহসুদ ১৯২২ সালে কলকাতার গার্ডেন রিচ ওয়ার্কশপে নির্মিত হয়। ১৯৮৩ সালে নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে স্টিম ইঞ্জিনকে ডিজেল ইঞ্জিনে রূপান্তর করা হয়। ১৯৯৫ সালে এটি মেকানিক্যাল গিয়ার সিস্টেমে রূপান্তরিত হয়। ২০২২ সালে চলাচল বন্ধ হওয়ার পর ৭০ লাখ টাকায় পুনরায় চলাচল উপযোগী করা হয়েছে।
স্টিমারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক প্রজন্মের গল্প। ব্রিটিশ আমল, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, পাকিস্তান আমল, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের সময়ের ইতিহাস এতে প্রতিফলিত। ১৯৬১ সালে ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ এতে চড়েন। ১৯৭৪ সালে যুগোস্লাভিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান মার্শাল টিটো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নৌবিহার করেন।
ব্রিটিশ আমলে ১৮৮৪ সালে স্টিমারের যাত্রা শুরু হয়। নারায়ণগঞ্জ থেকে খুলনা পর্যন্ত নৌপথে চলাচল করত। পরে পিএস গাজী, পিএস অস্ট্রিচ, পিএস মাহসুদ, পিএস লেপচা, পিএস টার্ন ও পিএস সেলার এই বহরে যুক্ত হয়।
সবুজ/রিফাত