বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে প্রত্যন্ত ঘাগুয়ার চর। গত পাঁচ বছরে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত এক হাজার বিঘা আবাদি জমি। একই সময়ে বাড়িঘর হারিয়ে গৃহহীন হয়েছে কমপক্ষে ৩০০ পরিবার। ভাঙন রোধে নেওয়া অস্থায়ী ব্যবস্থায় কোনো সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তারা জানান, চরজুড়ে এখনো ধান, পাট, ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজি চাষ হলেও যমুনার আগ্রাসনে প্রতিনিয়ত জমি ও বসতভিটা হারানোর আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের। স্থায়ী ব্যবস্থা না হলে সামনে আরও এক হাজার বিঘা জমি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বগুড়ার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, চরের উজানে নতুন করে একটি চর জেগে ওঠায় নদীর গতিপথ বদলে গেছে। ফলে ঘাগুয়ার চরের বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
ভাঙন রোধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঘাগুয়ার চরসহ তিনটি চরে স্থায়ী ভাঙন রোধে ৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক কাজ শেষ হয়েছে এবং শিগগিরই অনুমোদন মিলবে বলে আশা করছি।’
কাজলা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আনিস মোল্লা জানান, সম্প্রতি নদীভাঙনে তিনটি পরিবার তাদের বাড়ি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে আরও অন্তত ৫০টি পরিবার সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছরে চরের একটি বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। এ সময় অন্তত এক হাজার বিঘা ফসলি জমি হারিয়েছেন এলাকাবাসী।’
নিজের ক্ষতির কথা জানিয়ে আনিস মোল্লা বলেন, ‘আমার ছয় বিঘা জমি নদীতে গেছে, আর তিনবার বাড়ি সরাতে হয়েছে। এখন বছরে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় অন্যের জমিতে ঘর করে আছি।’
নদীভাঙনে সম্প্রতি যারা বাড়িঘর হারিয়েছেন তাদের মধ্যে মো. আবদুল লতিফ, জিয়াউল হক ও জিন্নাহ আকন্দ অন্যতম। ঘাগুয়ার চরের বাসিন্দা মালেকা বেগম জানান, সাত মাসে তাকে দুবার বাড়ি সরাতে হয়েছে। ভাড়া নেওয়া জমিতেই আগের বাড়ি নদীতে চলে গেছে। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী নদীতে জমি গেলে ভাড়ার টাকা ফেরত পাওয়া যায় না। এতে তার অন্তত ৫০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি দেড় বিঘা নিজস্ব জমিও হারিয়েছেন তিনি।
একই এলাকার সমেদ আলী মণ্ডল জানান, বাপ-দাদার কাছ থেকে পাওয়া ১০০ বিঘা জমির মধ্যে পাঁচ বছরে ৭০ বিঘাই নদীতে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত দুই মাসেই গেছে ৩৩ বিঘা। তিনি বলেন, ‘ভাঙন বন্ধ না হলে বাকি জমিও যমুনায় যাবে। তখন জীবন বাঁচতে ভিক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
চরের প্রবীণ বাসিন্দা তোতা মিয়া জানান, তাকে পাঁচবার বাড়ি সরাতে হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নদীতে গেছে তার অন্তত পাঁচ বিঘা জমি। তিনি বলেন, ‘এই চরের জমিতে প্রতি বিঘায় বছরে প্রায় দুই লাখ টাকার মরিচ হয়। গম, পাট, ভুট্টা আর ধানও হয় প্রচুর।’
কাজলা ইউনিয়ন পরিষদের আরেক সদস্য জানান, পাউবো চরের উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমাংশে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেললেও ভাঙন থামেনি। বিশেষ করে পশ্চিম তীরের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে উর্বর জমি ও ফসল নদীতে বিলীন হচ্ছে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার ইতোমধ্যে পাশের জেলা জামালপুরের বিভিন্ন উপজেলায় চলে গেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত স্থায়ী ভাঙন রোধ প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে ঘাগুয়ার চর পুরোপুরি বিলীন হওয়ার পাশাপাশি আরও শত শত পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়বে।