চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় সম্প্রতি বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। নিয়মিত খুন, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত মার্চ থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত উপজেলায় মোট ছয়টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও বেশির ভাগ আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন। এর ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গত ৩ মার্চ উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়নের ছনখোলা এলাকায় ডাকাত এসেছে- এ রকম গুজব ছড়িয়ে মো. নেজাম উদ্দিন ও মোহাম্মদ ছালেককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। ৭ জুন একই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দেওদিঘি এলাকায় মসজিদ কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে মো. দিদারুল আলম নামে একটি যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর একই ইউনিয়নের দেওদিঘি ছড়ারকুল এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে নুরুল কবির নামে এক দিনমজুরকে কুপিয়ে হত্যা উল্লেখযোগ্য।
সম্প্রতি উপজেলার কালিয়াইশ, খাগরিয়া, বাজালিয়া, কেঁওচিয়া, ছদাহা, সোনাকানিয়া ও ঢেমশা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে পথশিশুর ছদ্মবেশে বিভিন্ন মার্কেট ও দোকান থেকে মালামাল এবং যন্ত্রপাতি চুরি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর কেঁওচিয়া ইউনিয়নের ব্যবসায়ী হোছাইন মোহাম্মদ এহসানের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসহ প্রায় ১৮ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। সবশেষ গত সোমবার রাতে পুলিশ পরিচয়ে বাজালিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বড়দুয়ারা গ্রামের একটি বাড়ি থেকে তিনটি গরু লুট করে নিয়ে গেছে সংঘবদ্ধ ডাকাত দল।
গণপিটুনিতে নিহত আবু ছালেকের স্ত্রী সুরমি আক্তার অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার স্বামী ও তার বন্ধু মো. নেজাম উদ্দিনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আমি বাদী হয়ে ৪৭ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেছি। কিন্তু পুলিশ এখনো বেশির ভাগ আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। আসামিরা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘোরাঘুরি করছে। বিষয়টি আমি পুলিশকে অনেকবার জানিয়েছি। কিন্তু তার পরও তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। এতে আমার সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় জীবনযাপন করছি।
নিহত দিনমজুর নুরুল কবিরের মা মমতাজ বেগম বলেন, ‘চার ইঞ্চি জায়গার জন্য আমার ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমার ছেলের বউ, নাতি-নাতনিদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। এখন পর্যন্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। শুনেছি এক আসামি নাকি ইতোমধ্যে বিদেশ পালিয়ে গেছেন।’
উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গত সোমবার গভীর রাতে পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাতে পুলিশের টহল জোরদার এবং ভুয়া পুলিশ পরিচয়ধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
সাতকানিয়া রাস্তারমাথার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ‘রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়িতে গিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি না। কখন যে চোরের দল এসে তালা ভেঙে সব লুট করে নিয়ে যায়, সেই দুশ্চিন্তায় থাকি। আগের চেয়ে এখন চোরের উৎপাত বেড়েছে।’
সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, ‘অপরাধ বাড়ার পেছনে মাদক কারবার, বেকারত্ব, পারিবারিক কলহ ও সামাজিক অবক্ষয় কাজ করছে। এসব সমস্যা চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। এ ছাড়া সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করা হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসবে।’
এ বিষয়ে সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘আমি এ থানায় যোগদান করার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটা উন্নতি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলাগুলো পর্যালোচনা করে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং চুরি-ডাকাতি বন্ধে আমরা কাজ করছি।’
সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, ‘এওচিয়া ইউনিয়নের ডাবল মার্ডারের মামলাটি বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তদন্ত করছে। দিনমজুর নুরুল কবির হত্যা মামলাটি আমি পর্যালোচনা করে দেখব এবং আসামিদের শিগগির আইনের আওতায় আনা হবে। এ ছাড়াও কেঁওচিয়া ইউনিয়নের ডাকাতির ঘটনায় একটি মামলা রুজু হয়েছে এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’