হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা সংরক্ষিত বনাঞ্চল। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক বনটি এখন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও সংঘবদ্ধ পাচারকারীদের জিম্মায়। এমনকি সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এ বনকে রক্ষার দায়িত্বে থাকা বনরক্ষীরাও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সশস্ত্র হামলা, গুলিবিনিময় ও হুমকির ঘটনায় কার্যত আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে রেমা-কালেঙ্গা।
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) বন কর্তৃপক্ষ জানায়, গভীর রাতে কালেঙ্গা বিটের নিশ্চিন্তপুর পাহাড় এলাকায় সেগুন গাছ কাটতে যায় একটি সংঘবদ্ধ গাছচোর চক্র। খবর পেয়ে বনরক্ষীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাধা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। বনরক্ষী ও গাছচোরদের মধ্যে টানা আধাঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গুলিবিনিময় চলে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি সশস্ত্র চক্র এ সময় বনরক্ষীদের ওপর হামলা চালায়। ভারী অস্ত্রের মুখে একপর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হন বন-কর্মীরা। পরে খবর পেয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে গাছচোররা পালিয়ে যায়।
বন বিভাগ আরও জানায়, এ ঘটনায় বনরক্ষীরা ১৪ রাউন্ড এবং গাছচোর চক্র প্রায় ২০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। সৌভাগ্যক্রমে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও পুরো এলাকাজুড়ে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
কালেঙ্গা বিট কর্মকর্তা আল-আমিন বলেন, ‘আমরা নিয়মিত টহল দিই। কিন্তু গাছচোররা এখন ভারী অস্ত্রে সজ্জিত। একাধিক দিক থেকে তারা হামলা চালায়। জীবন বাঁচাতে আমাদের পিছু হটতে হয়। পরে বিজিবি ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তারা পালিয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘এখনও বিভিন্নভাবে তারা আমাদের হুমকি দিচ্ছে। বলা-বলি করছে, কিভাবে তারা গাছ বাঁচায়, আমরাও দেখে নেব।’
ভারত সীমান্তঘেঁষা চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য ১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর আয়তনের একটি বিস্তৃত বনভূমি। এ বনে রয়েছে অন্তত ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা ও লতাগুল্ম। এক সময় এখানে বিরল প্রজাতির বৃহৎ আকৃতির সেগুন, গর্জন, চাপালিশসহ নানা মূল্যবান গাছ দেখা যেত। ছিল নানা প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে অবাধ গাছ পাচারের ফলে আজ সেই বন মারাত্মক হুমকির মুখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে সক্রিয় কয়েকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট নিয়মিতভাবে বন থেকে মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করছে। এসব পাচারের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া থাকার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো সময় বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধেও গাছ পাচারে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা মারুফ মিয়া বলেন, ‘এ বনে এক সময় অনেক বড় বড় গাছ ছিল। কিন্তু এখন পুরো বন খুঁজেও খুব একটা বড় গাছ পাওয়া যাবে না। বছরের পর বছর ধরে গাছ পাচারের কারণে এগুলো শেষ হয়ে গেছে। কয়েকটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুরো বন উজাড় হয়েছে। সিন্ডিকেটগুলো এত বেশি শক্তিশালী যে, কেউ এর প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। আমরা প্রতিবাদ করলেও হামলা-মামলা করা হয়।’
আরেক বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, ‘অনেক সময় আমাদের চোখের সামনে দিয়েই গাছ কাটা হয়। কিন্তু আমরা কিছু বলতে পারি না। বললেই বাড়ি-ঘরে হামলা চালনো হয়। গত কয়েক বছরে পুরো বন উজাড় করে ফেলা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘অভ্যুত্থানের পর গাছ পাচার আরও বেড়েছে। এখন তারা অস্ত্র নিয়ে গাছ কাটতে আসে। কয়েক দিন আগেও বনের ভেতরে গোলাগুলি হয়েছে।’
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রেমা-কালেঙ্গায় গাছ পাচারের অন্যতম বড় সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে চুনারুঘাট উপজেলার আমতলা গ্রামের সুমন মিয়া। তার বিরুদ্ধে গাছ পাচারের পাশাপাশি মাদক ও অস্ত্র আইনে অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তার নেতৃত্বেই একাধিক সশস্ত্র চক্র বনাঞ্চলে তাণ্ডব চালাচ্ছে।
রেমা-কালেঙ্গার ডেপুটি রেঞ্জার আব্দুল হাদী বলেন, ‘আমরা সীমিত জনবল ও অস্ত্র নিয়ে দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু পাচারকারীরা এখন সংঘবদ্ধ ও সশস্ত্র। নিরাপত্তা জোরদার না হলে বন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে আমাদের জনবল বাড়ানো সবচেয়ে বেশি জরুরি।’
হবিগঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। কারণ চোরচক্র এখন অস্ত্র নিয়ে গাছ কাটতে আসে। প্রশাসন যদি তাদের হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রগুলো উদ্ধার না করে, তাহলে আমরা নিরাপদ হবো না। তাই এ ব্যাপারে প্রশাসনকে ভূমিকা পালন করতে হবে।’
কাজল/নাঈম