ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতে নাকাল যশোরের জনজীবন। গত এক সপ্তাহ ধরে অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গে কুয়াশা ও হিমেল হাওয়া শীতের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এরফলে গ্রামে-শহরে জেঁকে বসেছে তীব্র শীত।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) যশোরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বুধবারও যশোরে একই তাপমাত্রা বিরাজ করে। চলতি মৌসুমে এর আগে আরও দুদিন যশোরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। মাঝে গত সোমবার জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হলেও অনুভূত ছিল ৫/৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। টানা শৈত্যপ্রবাহে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষ। তারা কর্মহারা হয়ে পড়েছেন। শীতের তীব্রতা বাড়ায় হাসপাতালেও বেড়েছে রোগীর চাপ। ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন শিশু ও বয়স্করা।
যশোর বিমানবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, যশোরাঞ্চলে পৌষের দ্বিতীয় সপ্তাহেই মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়। এখন তাপমাত্রা আরও কমে গিয়ে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বিরাজ করছে। গতকাল (১ জানুয়ারি) যশোরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। বুধবারও একই তাপমাত্রা ছিল। এর আগে গত ২৭ ডিসেম্বর যশোরের তাপমাত্রা নেমে যায় ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এটি ওই দিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল। এর আগে ২৬ ডিসেম্বেরও দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল যশোরে।
এরপর তিন দিন তাপমাত্রার ব্যারোমিটারের পারদ সামান্য ঊর্ধ্বমুখী হলেও শীত কমেনি। বরং সূর্যের দেখা না মেলায় কুয়াশা আর উত্তরের বাতাসে বেড়েছে শীতের তীব্রতা। ফলে দিনমজুর, কৃষি শ্রমিকসহ খেটে খাওয়া মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। বিশেষ করে ভোর থেকে কাজে বের হওয়া দিনমজুর, ভ্যানচালক ও শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। প্রচণ্ড শীতের কারণে মানুষজনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। মোটা জ্যাকেট, মাফলারে ঢেকে মানুষজনকে জবুথবু হয়ে পথ চলতে দেখা যায়। হাড় কাঁপানো শীতে ঘর থেকে বের হননি অনেকে। ফলে শহরে মানুষের চলাচল অনেকটা কম দেখা গেছে।
শহরের উকিল বার চত্বরে কথা হয় রিকশাচালক রবিউল ইসলাম টুকুর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কুয়াশা আর উত্তরের বাতাসের কারণে শহরে লোকজন কম, যাত্রীও মিলছে না। শীতের জন্য রিকশায় কেউ উঠতে চায় না। তবুও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ঘর ছেড়ে বের হতে হচ্ছে।’
আরেক রিকশাচালক হায়দার আলী বলেন, দুদিন সূর্যের দেখা যায়নি। ঠাণ্ডা বাতাসে শীতের কষ্ট বেড়ে গেছে। শীত ও কুয়াশার মধ্যে খুব প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। যাত্রী কম হওয়ায় আয় কমেছে। খুব কষ্টে দিন পার করছি। হোটেল শ্রমিক আলী আহমেদ বলেন, চার-পাঁচ দিন ধরে খুব শীত পড়ছে। কষ্ট হলেও ভোরে কাজে বের হতে হচ্ছে। কাজ না করলে সংসার চলবে না। বাধ্য হয়ে এত শীতেও বের হয়েছি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ ডিগ্রি থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নেমে এলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ দশমিক ১ ডিগ্রি থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নেমে এলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ, ৪ দশমিক ১ ডিগ্রি থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নেমে এলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।
যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি গ্রামের কৃষক শাহাবুদ্দিন বলেন, সাধারণত তারা মাঠে যান সকাল ৭টার আগে। কয়েক দিনের ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের কারণে এখন মাঠে যেতে ৯টা থেকে ১০টাও বেজে যাচ্ছে। এখন মাঠে আলু ও বোরো ধান রোপণ ও পরিচর্যার কাজ চলছে।
যশোর শহরের লালদীঘি পাড়ে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষ শ্রম বিক্রির জন্য জড়ো হন। প্রচণ্ড শীতে সেই সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কাজ না পেয়ে অনেকেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ কাজের আশায় অনেক বেলা পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন।
শ্রমজীবী মনিরুল বলেন, শীতে একদিন কাজ পাই তো, তিন দিন পাই না। এক সপ্তাহ ধরে কাজ হচ্ছে না। শীতের মধ্যে প্রতিদিন ভোরে এসে বসে থেকেও কোনো লাভ হচ্ছে না।
জেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, মৃদু শৈত্যপ্রবাহের কারণে জেলায় রবি ফসল, বোরো ধানের বীজতলা এবং মৌ খামারিদের মধু সংগ্রহে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। জেলার আট উপজেলার মাঠে সরিষা, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল এবং বোরো ধানের বীজতলা রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষকদের ফসল সুরক্ষায় আগাম সতর্কতা ও করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন, যাতে কোনো ক্ষতি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
এদিকে শীতের তীব্রতা বাড়ায় ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রকোপও বেড়েছে। জ্বর, হাঁচি, কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। শীতকালীন রোগবালাই থেকে রক্ষা পেতে গরম পানি পান করা ও গরম কাপড় ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন নাজমুস সাদিক রাসেল।