চট্টগ্রাম নগরীতে কুকুর-বিড়ালের আক্রমণে ভুক্তভোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা বেড়েছে অন্তত চার গুণ। বিভিন্ন প্রাণীর কামড়-আঁচড়ের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভ্যাকসিন নিতে আসা সেবাপ্রার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাসাবাড়িতে কুকুর-বিড়াল পালনের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। এতে প্রচুর মানুষ তাদের পোষাপ্রাণীর মাধ্যমে আক্রান্ত হচ্ছেন।
এ ছাড়া সড়কে থাকা কুকুরও মানুষকে কামড়াচ্ছে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠা এসব কুকুর মানুষের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও পথের কুকুরের মাধ্যমে জলাতঙ্ক ছড়ানো ঠেকাতে সম্প্রতি মাঠে নেমেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। পাঁচ দিনের কর্মসূচির মাধ্যমে সংস্থাটি নগরে ৭০ শতাংশ কুকুরকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ছাড়া যারা এরই মধ্যে কুকুর-বিড়ালের মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের হাসপাতাল থেকে র্যাবিস ভ্যাকসিন (জলাতঙ্ক) দেওয়া হয়। সাধারণত কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ে জলাতঙ্ক ছড়ায়। সময় মতো টিকা দিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর আক্রমণের শিকার হয়ে চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল থেকে জলাতঙ্কের টিকা নিয়েছেন ৬ হাজার ৭০৯ জন। ২০২২ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮ হাজার। এ ছাড়া ২০২৩ সালে ১৪ হাজার ৩৩০ জন, ২০২৪ সালে ২৪ হাজার এবং ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ভ্যাকসিন নিয়েছেন প্রায় ২৬ হাজার জন। নারী-পুরুষ, শিশু সবাই আছেন সেবাপ্রার্থীদের তালিকায়।
চট্টগ্রাম নগরীর হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা সৈয়দুল হক বলেন, ‘চলাচলের পথে বেশকিছু বেওয়ারিশ কুকুর চোখে পড়ে—যেগুলোর ঘাড়ের ওপর বড় ধরনের ঘা থাকে। কোনোটার আবার মাথার ওপর ঘা। দূর থেকে দেখে মনে হয় গায়ে পচন ধরেছে, পোকা পড়েছে। এ কারণে বাসা থেকে বের হলেই ভয়ের মধ্যে থাকি। বিশেষ করে শিশুদের জন্য দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।’ আঘাতপ্রাপ্ত ও অসুস্থ কুকুরগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে কুকুর-বিড়ালের কামড়ানোর ঘটনা উদ্বেগজনকহারে বেড়ে গেছে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন বলেন, ‘নগরীর বাসাবাড়িতে পোষাপ্রাণী বিশেষ করে কুকুর ও বিড়াল পালনের সংখ্যা ব্যাপকহারে বেড়েছে। তাই নগরে পোষাপ্রাণীর আক্রমণের হারও বেড়েছে। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় মাঝেমধ্যে ভ্যাকসিনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা মাস শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। যতক্ষণ ভ্যাকসিন থাকে আমরা বিনামূল্য দিই। শেষ হওয়ার আগেই সংগ্রহের চেষ্টা করি।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইমাম হোসেন রানা বলেছেন, ‘নগরে কুকুরের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফলে এই প্রাণীর কামড়ে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কুকুরগুলোকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে চসিক। গত বছর ১৩ হাজার ২০০টি কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল। এ বছর ১৫ হাজার কুকুরকে দেওয়া হবে। নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে ৪৬টি টিমে ৯৬ জন প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে বিশেষ কৌশলে কুকুরগুলোকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। তাদের দুই দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে নগরের ৭০ শতাংশ কুকুর ভ্যাকসিনের আওতায় আসবে।’
চসিকের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হোসনে আরা বলেন, ‘গত ৫ জানুয়ারি থেকে চট্টগ্রাম নগরীর কুকুরগুলোকে ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে। আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে। উল্লিখিত সময়ে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত ভ্যাকসিন কর্মসূচি চলবে। কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়ার এটিই উত্তম সময়। এর আগে আরও তিনবার এমন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।’
এদিকে গত সোমবার সকালে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সামনে বেওয়ারিশ কুকুরদের ভ্যাকসিন প্রদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘‘পরিবেশগত ও আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে কুকুর নিধন সম্ভব নয়। এ কারণে ভ্যাকসিনেশনের মাধ্যমেই টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা হচ্ছে। কোনো একটি এলাকায় যদি অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুর ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আসে, তাহলে সেখানে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হয়। ফলে জলাতঙ্ক ভাইরাসের বিস্তার কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।’’