মাগুরায় কয়েক মাসের ব্যবধানে চোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় মামলা হলেও সেগুলোর তেমন অগ্রগতি নেই। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসামিও গ্রেপ্তার হয়নি। তদন্ত প্রক্রিয়াও চলছে ঢিমেতালে। এমন অবস্থায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ গত বুধবার সদর উপজেলার ইছাখাদা বাজারে গরুচোর সন্দেহে মো. আকিদুল (৪২) নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি পাকা কাঞ্চনপুর গ্রামের শহর আলীর ছেলে। এ ঘটনায় গত শুক্রবার নিহতের ছেলে চান মিয়া মাগুরা সদর থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা করেন। মাগুরা সদর থানার ওসি আশিকুর রহমান বলেছেন, হত্যা মামলাটিতে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে তদন্ত চলমান রয়েছে।
পুলিশ জানায়, বুধবার ভোরে ইছাখাদা বাজার এলাকায় গরুচোর সন্দেহে স্থানীয়রা আকিদুলকে আটক করে গণপিটুনি দেন। সকাল ৯টার দিকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে পাঠালে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর বৃহস্পতিবার সম্রাট নামের এক ব্যক্তি অজ্ঞানামা ব্যক্তিদের আসামি করে থানায় গরু চুরির মামলা করেন। উদ্ধার হওয়া গরুটি তার জিম্মায় দেওয়া হয়।
তবে নিহতের পরিবার এ ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যা দাবি করছে। নিহতের স্ত্রী অজিফা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হন। তার মোবাইল থেকে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারায় মনিরুল, লিয়াকতসহ কয়েকজন মিলে তাকে কাঁঠালগাছের সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করে।’
এর আগে গত বছরের ১০ আগস্ট মাগুরা সদর উপজেলার আলাইপুর গ্রামে চুরির অভিযোগে সজল হোসেন (২৩) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি ওই গ্রামের শরিয়ত মোল্লার ছেলে। এ ঘটনায় তার বাবা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ৪২ জনকে আসামি করা হয়, যাদের মধ্যে ২৭ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে। অথচ পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এ মামলায় মাত্র দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এ ছাড়া গত ১৬ সেপ্টেম্বর মহম্মদপুর উপজেলার জাঙ্গালিয়া গ্রামে মো. ইসরাফিল (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে মোবাইল ও নগদ টাকা চুরির অভিযোগে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের ভাই আবিদ হোসেন ২৮ জনকে আসামি করে মামলা করেন। এ মামলায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
মহম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল খায়ের বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্ত চলমান রয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করা গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে একই ধরনের অভিযোগ তুলে কয়েক মাসের ব্যবধানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটলেও প্রতিটি মামলার তদন্তে ধীরগতির কারণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নিহত ইসরাফিলের পরিবারের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কেউ অপরাধী হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে বিচারের মুখোমুখি করবে। এভাবে পিটিয়ে হত্যা তো আর বিচার নয়?’
মাগুরা পৌর শহরের কলেজ রোডের কাপড় ব্যবসায়ী রিপন মাহমুদ বলেন, ‘সম্প্রতি চুরির ঘটনা ব্যাপক হারে বেড়েছে। আমরা ব্যবসায়ীরা সব সময়ই আতঙ্কের মধ্যে থাকি। তবে চোরকে পিটিয়ে হত্যার বিষয়টি দুঃখজনক। প্রত্যেকেরই বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।’
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের মাগুরা জেলার আহ্বায়ক শম্পা বসু বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে মাগুরার ইছাখাদায় গরু চুরির অপবাদে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত বছর জেলায় দুজনকে মব ভায়োলেন্সে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের মানুষ আজ জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র তথা সরকারের। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকে মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, কোনো বিচার করেনি। অবিলম্বে মব সন্ত্রাস বন্ধ করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, বিচার করতে হবে।’
মাগুরার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি ছিল, এ কারণে এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। তবে এখন মাগুরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। চোর সন্দেহে যে কয়জনকে হত্যা করা হয়েছে, পরে দেখা গেছে তারা বিভিন্ন সময়ে চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তবে তার মানে এই নয় যে তাদের পিটিয়ে হত্যা করতে হবে। আমরা প্রত্যেকটি বিষয়ে তদন্ত করছি।’