চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) সংসদীয় আসনে নির্বাচনি জোটের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক। জোট সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-কে সমর্থন দেওয়ার কথা থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী এখনও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি এবং সরাসরি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন ভোটাররা। ভোটাররা এখনও বুঝতে পারছেন না ১১দলীয় জোটের প্রার্থী কে?
জানা যায়, এনসিপির প্রার্থী মো. জুবাইরুল হাসান আরিফকে ১১-দলীয় জোটের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম-৮ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তাকে জোটের সম্মিলিত সমর্থন দেওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ডা. আবু নাছের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক হাতে প্রচারণায় রয়েছেন। কেন্দ্রীয় নির্দেশে প্রচারণায় বিমুখ হওয়ার কথা থাকলেও মাঠে তার উপস্থিতি বিভ্রান্তি তৈরি করছে। জামায়াতের প্রার্থী নিজ নামে পোস্টার, লিফলেট ও কর্মীসমর্থকদের নিয়ে নির্বাচনি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। এতে জোটের সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ছে।
এনসিপি নেতারা অভিযোগ করে বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনটি জোট সমঝোতায় এনসিপির জন্য নির্ধারিত। সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে অন্যান্য শরিক দলের প্রার্থীদের সরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জামায়াতের প্রার্থী এখনও নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় থাকায় জোটের শৃঙ্খলা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এ বিষয়ে জামায়াত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা দাবি করেন, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিকে সমর্থন দিচ্ছেন। তবে প্রার্থী প্রত্যাহার না হওয়ায় এবং প্রচারণা চলমান থাকায় সেই সমর্থনের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না ।
স্থানীয় ভোটারদের অনেকেই বলছেন, একই জোটের দুই পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন প্রচারণা তাদের বিভ্রান্ত করছে। কে আসলে জোটের চূড়ান্ত সমর্থিত প্রার্থী—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গত ২ ফেব্রয়ারি জামায়াত আমিরের চট্টগ্রামের সমাবেশে এনসিপির নেতা জুবাইরুল হাসান আরিফের হাতে শাপলা কলি তুলে দিয়েছিলেন। এ সময় সমাবেশ থেকে ডা. নাছিরের স্লোগান দিয়ে উঠেছিল তার সমর্থকরা।
এরপর কয়েকদিন নীরব থাকার পর আবারও প্রচারণা শুরু করেছেন ডা. নাছির। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজে চান্দগাঁও শাহি জামে মসজিদের প্রচারণা চালান তিনি। আজ শনিবার সারাদিন বোয়ালখালি এলাকায় গণসংযোগ করেছেন। এ সময় দাঁড়িপাল্লায় ভোট চান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম-৮ আসনের এই পরিস্থিতি শুধু একটি আসনের বিষয় নয়; বরং জোট রাজনীতিতে কেন্দ্র ও মাঠ পর্যায়ের সমন্বয়হীনতার একটি উদাহরণ। দ্রুত স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না এলে নির্বাচনি প্রচারণার শেষ পর্যায়ে এই দ্বন্দ্ব আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে তারা মনে করছেন। জোটের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও জামায়াত প্রার্থী মাঠে এটি বড় ধরনের বিশ্বাস ভঙ্গের মতো কাজ।
চান্দগাঁও এলাকায় বাসিন্দা মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, আমরা কাকে ভোট দিব ভেবে পাচ্ছি না। দুই প্রার্থীই মাঠে।
ওই আসনের বহাদ্দার হাট এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ লোকমান বলেন, ব্যালটেও থেকে যাচ্ছে দাঁড়িপাল্লা। যার সুযোগ নিয়ে জামায়াতের প্রার্থী প্রচারণায় রয়েছেন। এতে বুঝা যাচ্ছে ১১ দলের সমঝোতা কেবল জোটে, ভোটে নয়।
এনসিপি প্রার্থীর সহযোগী ও প্রচারণা কমিটির সদস্য রাকিবুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, আমরা প্রচারণা মাঠে রয়েছি। বিভিন্ন এলাকায় ভোটাররাও আমাদের প্রশ্ন করছেন। আমরা জামায়াতের প্রার্থীর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জামায়াতকে জানিয়েছি। কিন্তু এখনও সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। জামায়াতের কর্মী সমর্থকরা প্রতিদিনই দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার জন্য প্রচারণা চালাচ্ছেন।
পুলিশ ও নির্বাচন কমিশন সূত্র বলছে, জোটের সিদ্ধান্ত অনুসারে জামায়াত প্রার্থী তার মনোনয়ন প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েও তা কার্যকরভাবে করেননি, ফলে নাম প্রার্থীর তালিকায় রয়েছে এবং ব্যালট পেপারেও দাঁড়িপাল্লা থেকে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি এনসিপি নেতাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা এবং সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এনসিপি নেতারা অভিযোগ করেছেন, জোটের নীতিবিরুদ্ধ আচরণ করতে এমন প্রার্থীর প্রচারণা চালানো সমর্থন নয়, বরং জোটের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
একই সময়ে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে এনসিপি ঘোষণা দিয়েছে যে, ওই এলাকায় জামায়াতের পক্ষে তারা আর প্রচারণা করবে না, যা জাতীয় জোটের সংহতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
এ ব্যাপারে জামায়াতের প্রার্থী মো. আবু নাছেরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াত ইসলামী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির জুবাইরুল হাসান আরিফের সঙ্গে আছি। কিন্তু জামায়াতের প্রার্থী আবু নাছেরকে স্থানীয় লোকজন উনার ভক্তরা মাঠে নামিয়েছেন। কারণ উনি দীর্ঘদিন মাঠে ছিল, এলাকার মানুষের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন। তাই সাধারণ মানুষ তাকে নিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছে। এখানে আমাদের করার কিছুই নেই।
মাহফুজ/