ঢাকার ধামরাইয়ে বধ্যভূমিতে নির্মিত স্মৃতিসৌধ সারা বছরই থাকে অবহেলিত, ময়লার স্তুপও রাত নামতে শুরু হয় মাদকসেবীদের আড্ডা। নোংরা ময়লা আবর্জনায় সব সময় থাকে ভরপুর। দেখভালের দ্বায়িত্বে কেউ না থাকায় সারাবছর অবহেলিত থাকে শহিদদের স্মরণে বধ্যভূমিতে নির্মিত স্মৃতি স্তম্ভটি।
দেশ স্বাধীনের ৪৪ বছর পর ঢাকা-২০ ধামরাই আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব এম এ মালেক ও সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের চেষ্টায় গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন ২০১৫ সালের ২৬ শে মার্চ।
কিন্তু স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পর থেকে শুধু ১৬ই ডিসেম্বর বিভিন্ন পেশাজীবীদের শুরুর দিকে ফুলেল শুভেচ্ছা দিতে দেখা গেলেও এখন আর তা দেখা যায় না। অথচ ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ জাতীয় দিবসেও নির্মিত স্মৃতিসৌধটি অযত্নে অবহেলায় পরে থাকে।
তাছাড়া ধামরাই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সংগঠন থেকেও স্মৃতিসৌধটির পবিত্রতা বা রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে কোনো খোঁজ-খবর নেন নি। সাপ্তাহিক বৃহস্পতিবার হাট বসে এখানে। এর জন্য আরও বেশি নোংরা অপরিষ্কার থাকে। স্মৃতি সৌধটির সঙ্গে ঘেষে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন মালামাল রাখা হয়।
স্মৃতি স্তম্ভটির চারদিকে কোনোরকম ইটের বাউন্ডারি দিলেও তার কোনো পলেস্তরার করা হয় নি। একাধিক জায়গায় ইট খসে পড়ছে। বাউন্ডারির ভিতরে খাবারের দোকান বসে। নোংরা করে রাখে স্থানটি। যার কোনো পবিত্রতাই নেই। কেউ কিছুই বলছে না। নেই কোনো মাথা ব্যথা।
অপরদিকে স্মৃতি সৌধটির বাউন্ডারির ভিতরে টং দোকান বসিয়ে সেখানে সারাদিন একশ্রেণির খারাপ লোক খোলামেলা তাস খেলতে দেখা যায়। আর সন্ধ্যা নামলেই চলে মাদকের ছড়াছড়ি। কেউ ক্রয় করছে আবার কেউ মাদক বিক্রি করছে বলে একাধিক ব্যক্তি জানান।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরের দিকে উপজেলার কালামপুর বাজারের শস্য বিক্রির হাটের পূর্ব উত্তর দিকের কর্ণারে নির্মিত স্মৃতি স্তম্ভটির এমন দৃশ্য দেখা যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে বিভিন্ন এলাকা থেকে পাকসেনারা ২০ জনকে ধরে এনে উপজেলার সূতিপাড়া-সানোড়া ইউনিয়নের মাঝামাঝি স্থানে শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক কালামপুর বাজারে সারিবদ্ধভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। ২০ জনের মধ্যে শোকলাল নামে এক ব্যক্তিসহ ৩ জন জীবিত ছিল। আজ তারাও নেই। সেখানে বধ্যভূমি শনাক্ত করে শহিদদের স্মরণে দেশ স্বাধীনের ৪৪ বছর পর নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতি সৌধ। কিন্তু সেই স্মৃতিসৌধটি সব সময়ই থাকে অবহেলিত অবস্থায়। দেখভাল করার জন্য নেই কোনো লোকজন।
বীরমুক্তিযোদ্ধা, উপজেলা প্রশাসন এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ওই স্মৃতিসৌধের বিষয়ে সারা বছর কোনো খোঁজ খবর নেয় নি। রাতের আঁধারে ওই স্মৃতিসৌধের মধ্যে বসে চলে মাদকসেবীদের আড্ডা। কালামপুর বাজার বনিক সমিতির সাবেক সভাপতি রবিউল করিম নিজ খরচে স্মৃতিসৌধের চারপাশে বাউন্ডারি তৈরি করে দেওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে তিনি কোনো কার্যকরী ভূমিকাই রাখেন নি।
কিন্তু শহিদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করা হলেও সেখানে কোনো শহিদদের নাম ফলক লেখা নেই। এছাড়াও এর চতুর্দিকে রয়েছে নোংরা-ময়লা আবর্জনার স্তূপ। সামনে রয়েছে কয়েকটি রুটি সবজির দোকান। আর স্মৃতি স্তম্ভটির ভিতরে রয়েছে কয়েকটি চুলা। যেখানে খাবার রান্না করা হয়। পাশ দিয়ে দুর্গন্ধ যুক্ত ময়লার ড্রেন রয়েছে। স্মৃতি সৌধের উত্তর পাশে ময়লা আবর্জনার স্তুপ করে রাখা হয়েছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। নেই বাজার কমিটির কোনো তদারকি। শহিদদের স্মরণে নির্মিত স্তম্ভটির পবিত্রতা রক্ষার কোনো ব্যবস্থাই নেই।
এ বিষয়ে শহিদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধটির সামনে রুটির দোকানদার গৌতম চন্দ্র সাহা (৩৫) ও রিপন চন্দ্র দাস (৩২) বলেন, আমরা স্মৃতিসৌধের সামনে দীর্ঘদিন ধরে খাবারের দোকান করছি। কখনো বাজার বনিক সমিতির লোকজন আমাদেরকে না করেন নি। তারা শুরু ভাড়া নিয়ে থাকে। যতটুকু সম্ভব আমরাই স্মৃতিসৌধটি পরিষ্কার করে রাখি। কেউ কখনো এর পরিষ্কারের বিষয়ে মাথা ঘামান নি। অনেকে পায়খানাও করে রাখে। দূগন্ধ এড়ানোর জন্য একাধিকবার আমরা মাটি দিয়ে চাপ দিয়ে রাখি। কারণ আমাদের দোকানে নাস্তা করার জন্য লোকজন আসে।
কালামপুর বাজার পরিষ্কারক বিপ্লব ডোম (২৮) বলেন, আমরা ময়লা আবর্জনা এমনকি মরা লাশ পরিষ্কার করি। কিন্তু কখনো আমাদের এই স্মৃতিসৌধটি পরিষ্কারের বিষয়ে কিছু বলেন নি। সারা বছরই এটি অবহেলিত থাকে। ময়লা আবর্জনা দিয়ে থাকে ভরপুর।
বিপ্লব আরও বলেন, আমরা এতো কিছু বুঝিনা। তবে স্মৃতিসৌধটির পবিত্রতা রক্ষার জন্য চারপাশে পরিষ্কার রাখা উচিত। পানির পাম্প লাগানো দরকার। সব সময় পানি দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার রাখা যায়। এছাড়াও স্মৃতিসৌধের উপর গাছের ডালপালা কেটে পরিষ্কার করতে হবে। আমি যেহেতু বাজার পরিষ্কার করি তাই আমি এটিও পরিষ্কার করবো। কিন্তু এটা আমাদের দ্বায়িত্ব না, বাজার কমিটির দ্বায়িত্ব। তারা আমাদের বুঝিয়ে দিলেই আমরা পরিষ্কারের কাজ করবো।
নুর মুহাম্মদ (৫০) নামে এক ব্যক্তি বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে কালামপুর বাজারে কাজের জন্য আসি। কিন্তু কখনো কাউকে শহিদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধটির পরিষ্কারের বিষয়ে কাউকে কাজ করতে দেখি নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, শহিদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধটি ধামরাই উপজেলা প্রশাসন কিংবা জেলা পরিষদ থেকে এর কোনো খোঁজ খবর নেয় না। তাছাড়া কালামপুর বাজারের আশেপাশের গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারাও খবর নেন নি। এর বিষয়ে কেউ গুরুত্ব দেয় না। তাছাড়া ধামরাই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সংগঠন থেকেও কোনো পদক্ষেপ নেন নি কখনো। স্থানীয়ভাবে স্মৃতিসৌধটির দেখভালের ব্যবস্থা করা উচিত।
কালামপুর বাজার বনিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মোসলেম উদ্দিন মুসা স্মৃতি স্তম্ভটির পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কিংবা পবিত্রতার বিষয়ে আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে কোন পদক্ষেপ নেন নি। পাক সেনারা বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজনকে ধরে এনে কালামপুরে গুলি করে হত্যা করেছিল। তাদের স্বরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধটির পবিত্রতা রক্ষার দ্বায়িত্ব আমাদের। যেকোনো জাতীয় দিবসের আগেই আমি নিজ উদ্যোগে এটি পরিষ্কারের ব্যবস্থা করবো। যাতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শহিদদের স্মরণে ফুলেল শুভেচছা পারে। সব সময় পরিষ্কার রাখারও ব্যবস্থা করবো। এর পাশে দোকানগুলো সরিয়ে দিবো যাতে স্মৃতিসৌধটি নোংরা ময়লা আবর্জনা না থাকে।
ধামরাই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড এর আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা মো. হাবিবুর রহমান তুলা বলেন, কালামপুর বাজারের পাশে আগে নদী ছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০ জনকে ধরে এনে পাকসেনারা গুলি করে হত্যা করেছিল। তাদের মধ্যে শোক লাল নামে এক ব্যক্তিসহ তিন জন বেঁচে যায়। এখন তারাও জীবিত নেই। শহিদদের স্মরণে ওই বধ্য ভূমিতে যে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে এর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের একান্তই কর্তব্য। আমি ওই বধ্যভূমিতে নির্মিত স্মৃতিসৌধটির বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এর সঙ্গে কথা বলবো। কীভাবে সব সময় এটি পরিষ্কার রাখা যায় এবং সৌধটির মধ্যে শহিদদের নাম খোদাই করে লেখার ব্যবস্থা করবো।
রুহুল আমিন/মাহফুজ