বরিশাল নগরীর ৯নং ওয়ার্ডের রসুলপুর কলোনি। কীর্তনখোলা নদীর তীরে গড়ে ওঠা অনগ্রসর এই জনবসতিতে নেই কোনো স্থায়ী শহিদ মিনার। ফলে এক যুগের বেশি সময় ধরে স্থানীয় শিশুরা তাদের টিফিনের টাকা জমিয়ে ইট, কাগজ, বাঁশ, কাঠ ও মাটির সাহায্যে ছোট ছোট শহিদ মিনার তৈরি করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে। শিশুরা পুরো মহল্লার প্রায় অর্ধশত ঘরের পাশে অস্থায়ী শহিদ মিনার তৈরি করে। প্রতিটি মিনারে ফুল দিয়ে ভাষাসৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে এ আয়োজন চলমান।
স্থানীয়রা জানান, ২০১১ সালে শহিদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই থেকে প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি রসুলপুর কলোনির শিশুরা নিজেদের হাতে শহিদ মিনার তৈরি করে ভাষা দিবস পালন করে। তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তী এই কাজে সহযোগিতা করেন। পরবর্তী সময়ে শিশুকেন্দ্রিক হলেও পুরো মহল্লার মানুষ এ কাজে যুক্ত হন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোকলেছ মিয়া বলেন, ‘শিশুরা শহিদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই স্কুলের টিফিনের টাকা জমানো শুরু করে। সেই টাকা দিয়ে তারা শহিদ মিনার তৈরি করে।’
সনিয়া বেগম নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘শিশুরা শুধু মিনার বানায় না, তারা শহিদদের ইতিহাসও জানছে। তাই আমরা তাদের সহযোগিতা করি। আমার ছেলে মামার দেওয়া টাকায় রঙিন কাগজ, রং ও কাঠ কিনে শহিদ মিনার বানিয়েছে।’
মাসুদ মিয়া নামে আরেকজন বলেন, ‘এই এলাকার বেশির ভাগ শিশুই প্রতিদিন টিফিনের টাকা জমিয়ে শহিদ মিনার তৈরি করে তাতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।’
অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আক্তার কাশপিয়া বলে, ‘আমাদের এলাকায় স্থায়ী শহিদ মিনার নেই। তাই আমরা নিজেরা ছোট আকারে অস্থায়ী শহিদ মিনার বানিয়ে ভাষাশহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। বাবা-মায়েরাও আমাদের সহযোগিতা করেন।’
সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) বরিশাল জেলা কমিটির সদস্যসচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শহরে নানা আয়োজন থাকে। রসুলপুর কলোনির শিশুরা নিজের হাতে শহিদ মিনার তৈরি করছে। আমরা তাদের সহযোগিতা করছি। শিশুদের মানসিক বিকাশ, চিত্রাঙ্কন ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজনের মাধ্যমে দেশপ্রেম ও দেশভক্তি তৈরি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি বরিশালের অতিদরিদ্র এলাকা। শিশুরা প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠে। তাই সরকারি উদ্যোগে এখানে একটি স্থায়ী শহিদ মিনার নির্মাণ জরুরি।’
চকবাজার (রসুলপুর) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আফরোজা খানম বলেন, ‘৫ হাজারের বেশি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসা রয়েছে। কিন্তু এই দুই প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী শহিদ মিনার নেই। তাই আমরা কাঠ দিয়ে অস্থায়ী শহিদ মিনার তৈরি করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং মহান শহিদ দিবস পালন করে আসছি। পাশাপাশি এই মহল্লার প্রায় প্রতিটি ঘরের শিশুরাও নিজ হাতে মিনার বানিয়ে ভাষা দিবস পালন করছে।’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী বলেন, রসুলপুর এলাকাটি মূলত কীর্তনখোলা নদীতে জেগে ওঠা চরের একটি অনগ্রসর পল্লি। ওই এলাকার জমি নিয়ে বিভিন্ন জটিলতা রয়েছে। শহিদ মিনার নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি দিতে এখনো কেউ আগ্রহ দেখাননি। তবে আগামী বাজেটে রসুলপুর কলোনি এলাকায় শহিদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।