চারদিকে সুনসান নীরবতা। ঘড়িতে সকাল ৯টা বেজে গেছে। কিন্তু দু-একজন ছাড়া কাউকে অফিসে দেখা যাচ্ছে না। এই চিত্র বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো), উত্তরাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের। সকাল ৯টা ১০ বাজার পর দেখা গেল অফিসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা এক-দুজন করে আসছেন এবং রুমের তালা খুলছেন। কোনো কোনো রুম অবশ্য সকাল ৯টা ৪০ পর্যন্ত তালাবদ্ধ দেখা যায়।
গত মঙ্গলবার রংপুরে বাপাউবোর উত্তরাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর অফিসে সকাল ৯টায় উপস্থিত হন খবরের কাগজের এই প্রতিনিধি। বিকেল প্রায় ৪টা পর্যন্ত থেকে লক্ষ করা হয় এই হালচাল।
ওই অফিসের উপসহকারী প্রকৌশলী এনামুল হক মোল্লা সকাল ৯টা ৪১ মিনিটে আসেন। নির্বাহী প্রকৌশলী এ টি এম রেজাউর রহমান আসেন সকাল ১০টার পর এবং ত্যাগ করেন বেলা ২টা বাজার আগেই। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি একটু অফিসের কাজে বিআরটিএ অফিসে গিয়েছিলাম।’
আর এক নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান আসেন সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে। কেন দেরিতে এসেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারি নির্দেশ মানতেছি। আজকে একটু দেরি হয়ে গেছে।’
ওই অফিসের গবেষণা কর্মকর্তা মাজেদুল ইসলাম আসেন সকাল ১০টা ৪৮ মিনিটে। তিনি বলেন, ‘আমি কম্পিউটারের কাজে গিয়েছিলাম। তাই আসতে দেরি হয়েছে।’
প্রধান প্রকৌশলীর অফিসের সহকারী পরিচালক আ. মাজেদ অফিসে এসেছেন দেরিতে। ছুটি না নিয়েই বেলা ২টার আগে অফিস ত্যাগ করেন। কেন ছুটি নেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আমার এক কলিগকে বলে এসেছি। একটু কাজ আছে, তাই গাইবান্ধায় এসেছি।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব খন্দকার মনোয়ার মোর্শেদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ এবং সচিবালয় নির্দেশমালা এবং ২০২৪-এর ৮৬ সংখ্যক নির্দেশ মোতাবেক সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীর নির্ধারিত সময়ে অফিসে হাজির ও প্রস্থানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
কিন্তু নির্ধারিত অফিস সময় যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে নিয়মের তোয়াক্কা না করেই চলছে বাপাউবোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে যাওয়া-আসা।
সকাল ৯টা ২৩ মিনিটে রংপুর পানি উন্নয়ন সার্কেল-১-এর অফিস খোলেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ইউনুস আলী। তিনি বলেন, ‘হাই লেভেলের কর্মকর্তারা ২৪ ঘণ্টাই ডিউটি করেন। আর আমরা কর্মচারীরা কেউ কেউ সকাল সাড়ে ৯টা/১০টার পরে আসি।’
বাপাউবোর রংপুর সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীবের ব্যক্তিগত সহকারী মানব কুমার সেন সকাল ১০টা ১৬ মিনিট পর্যন্ত অফিসে আসেননি। কেন আসেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সকালে এসেছি, এসে ডিভিশন অফিসে গিয়েছিলাম। বড় বাবুর রুমে গিয়েছিলাম। স্যার নেই, এ জন্য আমার দেখা পান নাই।’
উপসহকারী প্রকৌশলী (প্রাক্কলনিক) আসাদুল ইসলাম। তিনিও আসেননি সকাল ১০টা ১৬ মিনিট পর্যন্ত। ওই অফিসের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) আকতারা বানু। তাকেও সকাল ১০টা পর্যন্ত অফিসে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘আমি অন্য অফিসে ছিলাম। আজকে রুম পরিষ্কার করতে হবে। ক্লিন না হওয়া পর্যন্ত আমরা অফিসে আসি না।’
এ বিষয়ে বাপাউবোর রংপুর সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীবকে মুঠোফোনে কল করে ও হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাপাউবোর রংপুর সার্কেল-২-এর অফিসে সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত কেউ আসেননি। তবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান আসেন ৯টা ৪৫ মিনিটে। এদিকে তার পিএ মাহফুজ আসেন ৯টা ৪৭ মিনিটে।
এ বিষয়ে ওই প্রকৌশলী বলেন, ‘আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসের বিভিন্ন সমস্যা থাকে। মাঠপর্যায়ে সমাধান করে অফিসে আসতে হয়। এর বাইরেও কিছু অভ্যাসগত সমস্যা আছে। তাদের মোটিভেট করছি সমাধান করার। তার পরও যদি সময়মতো না আসেন, তবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ আপনি কেন দেরিতে এসেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আজকে ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়েছে।’
আঞ্চলিক হিসাব কেন্দ্রের (র্যাক) উপ-পরিচালক আশেকুল ইসলামও দেরিতে এসেছেন। তিনি ও তার অফিসের কর্মচারীরা কেন দেরিতে এসেছেন জানতে চাইলে আশেকুল ইসলাম বলেন, রমজান মাসে ৫-১০ মিনিট দেরি হতেই পারে।
বাপাউবোর রংপুর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরেরও একই চিত্র। নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম নিজেই অফিসে উপস্থিত হয়েছেন বেলা ১১টা ৫ মিনিটে। তিনি বলেন, ‘বাস্তবতা হলো এসও ও এসডি যারা আছেন, তাদের সাইটে যেতে হয়। অনেকের আবার সাইট থেকে ফিরতে ফিরতে দেরি হয়। আমি দেরিতে এসেছি, কারণ আমি ছুটিতে আছি। অডিটের লোক এসেছে বলেই অফিসে এসেছি।’
ওই বিভাগের উচ্চমান সহকারী জিয়াউর রহমান অফিসে আসেন ১০টা ৫ মিনিটে। কেন দেরিতে এসেছেন জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার বাচ্চার জ্বর, তাই আসতে দেরি হয়েছে।’
বাপাউবোর রংপুর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যালয়ের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা এনামুল হক অফিসে এসেছেন সকাল ১০টা ৪ মিনিটে। কেন দেরিতে এসেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সকালে এসে ডিসি অফিসে যেতে হয়, সেখানে গিয়েছিলাম। ওখানে কাজ শেষে এই অফিসে আসতে হয়, তাই দেরি হয়েছে।’
বাপাউবোর রংপুর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আশরাফুল আলম সকাল ১০টা ৭ মিনিটেও অফিসে আসেননি। তার অফিসের উপসহকারী প্রকৌশলী ইমরান হোসাইন এসেছেন সকাল সাড়ে ৯টায়। অপর দুই উপসহকারী প্রকৌশলী রাশেদী মাওলা ও পিয়াস চন্দ্রকে সকাল ১০টা ১০ মিনিটেও অফিসে পাওয়া যায়নি।
এসব অনিয়মের বিষয়ে বাপাউবোর রংপুরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) ড. মোহা. সরফরাজ বান্দা বলেন, অফিসে নির্দিষ্ট সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। রোজার মাসে সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত অফিসে থাকার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেউ গাফিলতি করলে তদন্ত সাপেক্ষে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।