সোয়া এক লাখ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার ১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। হাসপাতালটি ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত হলেও বাড়েনি চিকিৎসকের সংখ্যা। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ঠিকমতো হাসপাতালে আসেন না। ফলে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে টুঙ্গিপাড়াসহ আশপাশের আরও কয়েক উপজেলার মানুষ।
রোগীদের অভিযোগ, টুঙ্গিপাড়া হাসপাতালে পাঁচজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেও তারা নিয়মিত রোগী দেখেন না। আসেন নিজেদের ইচ্ছেমতো। এ ছাড়া রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্ট ছাড়া দেখতে না চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে এসব বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানভীর আহমেদ প্রথমে চিকিৎসকদের পক্ষে সাফাই গেয়ে পরে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত মঙ্গলবার বেলা ১১টা ১০ মিনিটে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় ২০৭ নাম্বার কক্ষে প্রবেশ করেন অর্থোপেডিক চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালটেন্ট) কাজী করিম নেওয়াজ। বেলা ১১টা ২০ মিনিটে ২০৬ নম্বর কক্ষের শিশু চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালটেন্ট) ডা. আমামা আক্তারের কক্ষটি ছিল তালাবদ্ধ। পরে তাকে মোবাইলে কল দিলে ১১টা ৫০ মিনিটে নিজের কক্ষে আসেন তিনি। গাইনি চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালটেন্ট) ডা. শিপ্রা নন্দীর কক্ষটিও ছিল তালাবদ্ধ। কারণ সপ্তাহে মাত্র দুই দিন টুঙ্গিপাড়া হাসপাতালে আসেন তিনি। সেই হিসাবে মাসে মাত্র আট দিন এসে তুলছেন পুরো মাসের বেতন। চক্ষু চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালটেন্ট) ডা. আবির মল্লিক হাসপাতালে ছিলেন না। আর জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেস্থেসিয়া) ডা. মো. শাহজাহানের পোস্টিং টুঙ্গিপাড়া হলেও তিনি সব সময় থাকেন মুকসুদপুরে। তাই তাকেও পাওয়া যায়নি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কনসালটেন্ট ১০টি ও জুনিয়র কনসালটেন্ট ১১টিসহ মোট ২১টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র পাঁচজন জুনিয়র কনসালটেন্ট।
টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতী গ্রামের রানা শেখ অভিযোগ করে বলেন, ‘গত রবিবার সকালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পান। হাসপাতালে গিয়ে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেও অর্থোপেডিক চিকিৎসকের দেখা পাইনি। পরে গোপালগঞ্জ শহরে গিয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে অন্য অর্থোপেডিক ডাক্তার দেখিয়েছি। এতে সময় আর অর্থ দুটোই ব্যয় হয়েছে।’
এ ছাড়া চিকিৎসা নিতে আসা বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার কলাতলা গ্রামের আরাফাত হোসেন বলেন, ‘টুঙ্গিপাড়া হাসপাতাল আমাদের খুব কাছে। আমরা এ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকি। এখানে চিকিৎসকের সংখ্যা কম। তার পরও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নিয়মিত আসেন না। আমাদের সঙ্গে চিকিৎসকরা দুর্ব্যবহার করেন। তাদের বলে দেওয়া নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট দেখেন না।’
পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার সাচিয়া গ্রামের আবু আমের বলেন, ‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এখানে নিয়মিত থাকেন না। তাই আমরা ভালো চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হই। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষা করে তারা নিজেদের মনমতো কর্মস্থলে আসেন। আমাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
বেলা ১১টা ১০ মিনিটে আসার বিষয়ে টুঙ্গিপাড়া হাসপাতালের অর্থোপেডিক চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালটেন্ট) ডা. কাজী করিম নেওয়াজ বলেন, ‘এক মাসও হয়নি এখানে যোগদান করেছি। বেতন-ভাতা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে আসতে একটু দেরি হয়েছে।’
শিশু কনসালটেন্ট ডা. আমামা আক্তার বলেন, ‘একটু শরীর খারাপ থাকায় আসতে দেরি হয়েছে।’ এ ছাড়া গাইনি চিকিৎসক ডা. শিপ্রা নন্দী, চক্ষু চিকিৎসক আবির মল্লিক ও জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেস্থেসিয়া) ডা. মো. শাহজাহানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। এ কারণে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এসব বিষয়ে প্রথমে চিকিৎসদের পক্ষে সাফাই গেয়ে পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানভীর আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘অর্থোপেডিক চিকিৎসকের বাসা দূরে হওয়ায় আসতে একটু দেরি হয়। আর শিশু ও চক্ষু চিকিৎসক ছুটির আবেদন করেছেন।’ তবে আবেদনের কোনো লিখিত কপি দেখাতে পারেননি তিনি। আর জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেস্থেসিয়া) ডা. মো. শাহজাহানের মূল কর্মস্থল টুঙ্গিপাড়া হলেও আগের সিভিল সার্জনের নির্দেশে তিনি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে থাকেন, টুঙ্গিপাড়া আসেন না। এ ছাড়া অনিয়মিত চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা দেওয়ার পর ঠিক না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।