পরিবারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন সদর আলী। পরিকল্পনা ছিল ঋণের বোঝা কমিয়ে দুই মেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে ভালো জায়গায় বিয়ে দেওয়া। কিন্তু এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা সেই স্বপ্নকে চূর্ণ করে দিয়েছে। মালদ্বীপে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার বাসিন্দা সদর আলী (৪৫)। নিহতদের আরেকজন লক্ষ্মীপুর সদরের হাজিরপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা তাজ উদ্দিন। পরিবারের অভাব মেটাতে তিনিও গিয়েছিলেন মালদ্বীপে। কিন্তু সেখান থেকে আর জীবিত ফেরার সুযোগ থাকল না।
জানা গেছে, সদর আলী বানিয়াচংয়ের উপজেলার মহব্বতখানি মহল্লার বাসিন্দা। গত ১২ মার্চ রাতে সাহরির আগে রান্না করা খাবার গরম করার সময় মালদ্বীপের রাজধানী মালে থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে দিগুরা আইল্যান্ডের একটি বাসায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচ বাংলাদেশি নিহত হন। আহত হন আরও দুইজন।
শনিবার সদর আলীর বাড়িতে গিয়ে শোকের মাতম দেখা যায়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তার স্ত্রী। পরিবার সূত্রে জানা যায়, আর্থিকভাবে অসচ্ছল সদর আলী তিন সন্তানের জনক ছিলেন। সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে এবং কন্যাদায় থেকে মুক্তি পেতে প্রায় দুই বছর আগে তিনি মালদ্বীপে পাড়ি জমান। কিন্তু প্রবাস জীবনের ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা তছনছ করে দিয়েছে পরিবারের সব প্রত্যাশা।
নিহতের বড় মেয়ে মীম আক্তার বানিয়াচং জনাব আলী সরকারি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বাবার মৃত্যুর খবরে তিনি ভেঙে পড়েছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মীম জানান, শুক্রবার ভোরে সাহরি খেতে বসার সময় মালদ্বীপ থেকে বাবার এক সহকর্মী ফোন করেন। ফোনে তিনি জানান, তাদের বাসায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সদর আলীসহ সাতজন গুরুতর আহত হয়েছেন। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন করে সদর আলীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। এ খবর শোনার পর পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।
মীম বলেন, ‘বাবা আমাদের ভালো ভবিষ্যতের জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন আমরা কীভাবে চলব, আমাদের পড়াশোনা কীভাবে হবে, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
নিহতের বড় ভাই জমির আলী জানান, তারা আট ভাই। এর মধ্যে সদর আলী ছিলেন চার নম্বর। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। মেয়েরা বড় আর ছেলেটি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে।
তিনি বলেন, ‘সংসার চালাতে গিয়ে সদর আলী অনেক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। মেয়েদের বিয়ের চিন্তা আর সংসারের দায়ে শেষ পর্যন্ত এই বয়সেই বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আমরা অনেক নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু সে বলত— মেয়েগুলো বড় হয়েছে, তাদের বিয়ে দিতে হবে।’
জমির আলী আরও জানান, দেশে থাকতেই সদর আলীর কিছু ঋণ ছিল। পরে বিদেশ যাওয়ার জন্য বিভিন্নজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে আরও ঋণ নেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকার বেশি ঋণের বোঝা রয়েছে। এখন সেই ঋণ শোধ করা এবং পরিবার চালানো- দুটোই বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিহতের ছোট ভাই জয়ধর আলী বলেন, ‘পরিবারটি এখন চরম বিপদে রয়েছে। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, দ্রুত মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করা এবং পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো হোক।’
ঈদ কেনাকাটার টাকা পাঠাতে চেয়েছিলেন তাজ উদ্দিন
পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করতে প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় করে ছয় মাস আগে মালদ্বীপে পাড়ি জমান তাজ উদ্দিন। সেখানে একটি নির্মাণাধীন আবাসিক হোটেলে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। শুক্রবার বিকেলে তার মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছালে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা এখন পাগলপ্রায়।
নিহতের স্ত্রী অনন্তি বেগম স্বামীর মৃত্যুর খবরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তিনি জানান, ছয় মাস আগে ধারদেনা করে মালদ্বীপে যান তাজ উদ্দিন। ঘটনার দুদিন আগে তার সঙ্গে কথা হয়। ঈদে কেনাকাটার জন্য তিনি টাকা পাঠাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কে জানত, ওইটাই ছিল তার সঙ্গে শেষ কথা। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তাজ উদ্দিন চার বোনের একমাত্র ভাই। তার চার মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।