বৃষ্টিতেও জমজমাট সিলেটের ঈদ বাজার। গত দু-তিন দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে সিলেটে। গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৬টা থেকে রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত) সিলেটে ৭১.৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করেছে সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তর। এই বৃষ্টিতে ভিজেও মানুষজন রাতভর ঈদের কেনাকাটা করেছেন। ঈদের কেনাকাটায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকায় পুরো শহরেই যানজট লেগে ছিল। বৃষ্টির মধ্যে এই যানজট নিরসনে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে।
দুয়ারে কড়া নাড়ছে ঈদুল ফিতর। এবার সিলেটে রমজানের শুরু থেকেই জমে উঠেছে ঈদবাজার। ১৫ রোজার পর থেকে ঈদবাজারে আরও ভিড় বাড়তে থাকে। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে সিলেটের মার্কেট, ফ্যাশন হাউস, শপিংমল, ছোটখাটো বিপণিবিতান, হকার্স মার্কেট থেকে ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের দোকানেও উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। ক্রেতাদের এই সমাগম এখন সেহেরি পর্যন্ত চলে।
শনিবার (১৪ মার্চ) সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুর থেকে ক্রেতারা মার্কেট ও শপিংমলে কেনাকাটা করতে আসতে শুরু করেন। ইফতারের মিনিট পাঁচেক আগ পর্যন্ত চলে কেনাকাটা। এরপর ইফতার শেষেই আবার শুরু হয় ক্রেতাদের চাপ। রাত যত বাড়ে, ক্রেতা তত বৃদ্ধি পায়। গভীর রাত পর্যন্ত মানুষজন কেনাকাটা করেন। ঈদের কেনাকাটায় ঝড়-বৃষ্টিও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। শনিবার রাত ১০টার দিকে বৃষ্টি শুরু হয়। এই সময়ও নগরীর প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজারে পা ফেলার জায়গা ছিল না। এই সড়কে যেমন তালে যানবাহন চলছিল, তেমনি পায়ে হেঁটেও মানুষজন কেনাকাটা করতে চলাচল করছিলেন। হাতে ব্যাগ নিয়ে গা ঘেঁষে চলাফেরা করতে দেখা গেছে ঈদবাজার করতে আসা মানুষজনকে।
সিলেট নগরীর অভিজাত শপিংমল হিসেবে পরিচিত জিন্দাবাজার এলাকার ব্লুওয়াটার শপিং সিটি, কাকলী শপিং সেন্টার, সিটি সেন্টার, আল-হামরা শপিং সেন্টার, সিলেট প্লাজা, জেলরোড, বারুতখানা ও কুমারপাড়ার ফ্যাশন হাউসগুলোর শোরুমে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা কেনাকাটা করছেন। পাশাপাশি বন্দরবাজার ও হকার্স মার্কেটেও নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল।
নগরীর জিন্দাবাজারস্থ বিপণিবিতান ‘রিয়েল টাচ’-এর পরিচালক উৎপল রায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘রমজানের শুরুতে ক্রেতা সমাগম কম ছিল। তবে ১৫ রোজার পর ক্রেতা বেড়েছে। তবে এবার ঈদবাজারে মানুষের বাজেট অনেক কম মনে হয়েছে। এটি হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে। কারণ সিলেটে অনেক মানুষ ইউরোপ-আমেরিকার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যেও থাকেন। এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হয়তো প্রবাসীরা সীমিত টাকা পাঠিয়েছেন, তাই কিছু ক্রেতার বাজেট সীমিত মনে হয়েছে।‘’
জিন্দাবাজার এলাকার ব্লুওয়াটার শপিং সিটির বাচ্চাদের কাপড়ের দোকান ‘খাদিজা বেবি শপ’-এর পরিচালক ইমন আহমদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ক্রেতা সমাগম অনেক। মানুষজন কেনাকাটা করছেন। আমাদের বিক্রিও অনেক ভালো হচ্ছে।’
ঈদের পোশাক কিনতে আসা নগরীর নবাবরোড এলাকার বাসিন্দা আরিশা খবরের কাগজকে বলেন, ‘এবার ঈদে কাপড়ের ডিজাইন ও গুণগত মান খুব একটা ভালো মনে হয়নি। নামীদামী ব্র্যান্ডের ফ্যাশন হাউসগুলোতেও খুব বেশি মানসম্মত কাপড় আসেনি। অনেকে নতুন কিছু না এনে পুরোনো কালেকশনই আবার বিক্রির জন্য এনেছেন। আবার দামও বৃদ্ধি করেছেন।’
নগরীর জিন্দাবাজার এলাকায় ঈদের কেনাকাটা করতে আসা ইমা রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদে নারীদের জন্য কোনো না কোনো ট্রেন্ডের পোশাক আসে, যেটা কিনতে সবাই ভিড় করেন। কিন্তু এবার তেমন কোনো ট্রেন্ডি পোশাক আসেনি। তাই আমার মতো যারা ট্রেন্ড ফলোয়ার তারা এটি মিস করছি। এবার সবই গতানুগতিক পোশাক, কিন্তু দাম অনেক বেশি। তারপরও বাজেট অনুযায়ী কেনাকাটা করছি।’
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখার মহাসচিব ও সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপন খবরের কাগজকে বলেন, ‘এবার প্রায় সবারই ভালো ব্যবসা হচ্ছে। কারণ নির্বাচন ছিল ১২ ফেব্রুয়ারি, আর এই নির্বাচনের কারণে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে অনেক প্রবাসী দেশে এসেছেন। তখনই আমরা ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলাম এবার ঈদে ভালো ব্যবসা হবে। কারণ নির্বাচনের পরই রোজা শুরু হওয়ায় এই প্রবাসীরা দেশে ঈদ করার জন্য থেকে যাবেন। আমাদের ধারণা ঠিক হয়েছে। ফলে এবারের ঈদে ক্রেতা সমাগম অনেক বেশি হচ্ছে। তবে আমরা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে। কারণ সিলেটের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী। আমাদের টার্গেট ক্রেতাদের বড় অংশ তারাই। যুদ্ধের কারণে এবার ঈদে মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসীদের পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কগ্রস্ত। ফলে এবার বেশিরভাগ ক্রেতার বাজেট সীমিত দেখা গেছে। তবে একথা বলা যায়, মানুষ উৎসবের আমেজে কেনাকাটা করছেন।’
ঈদবাজারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘মানুষ যেন নিরাপদে ঈদবাজার করতে পারেন, সে জন্য সিলেট মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নগরীর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও মার্কেটে পুলিশ সদস্যরা ডিউটিরত আছেন। নগরীতে তল্লাশি চৌকি বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া যানজট নিরসনে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে সাদা পোশাকেও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।’
রিফাত/