কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা বরিশালে ধীরে ধীরে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন–এমন আলোচনা স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো হচ্ছে। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে দল পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই তারা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা।
এরই অংশ হিসেবে গত শুক্রবার নগরের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের রজনীগন্ধা কমিউনিটি সেন্টারে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের শতাধিক নেতা-কর্মীর অংশগ্রহণে একটি ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক নেতারা। পাশাপাশি কয়েকজন সাবেক জনপ্রতিনিধিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বরিশালে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের এটি প্রথম বড় ধরনের প্রকাশ্য সমাবেশ বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দলীয় সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে সংগঠনকে নতুন করে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুক্রবারের ওই ইফতার মাহফিলকে সেই উদ্যোগেরই প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইফতারে অংশ নেওয়া কয়েকজন নেতা বলেন, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে দলকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই তারা একত্র হয়েছেন। সংকটময় সময়ে সংগঠনকে নতুন করে গুছিয়ে তোলাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
তৃণমূলের কয়েকজন নেতা জানান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতা গ্রহণের পর বরিশালে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মী কারামুক্ত হয়েছেন। আবার ৫ আগস্টের পর যারা আত্মগোপনে ছিলেন, তাদের মধ্যেও অনেকে ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসছেন।
এর মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. ইউনুস, বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন, সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন, বাকসুর সাবেক ভিপি মঈন তুষার, সাবেক কাউন্সিলর এনামুল হক বাহার, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন নেতা আবার রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেছেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব দেশ ছাড়ায় স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ আগেই দেশ ছেড়েছেন। এরপর তার ভাই ও বরিশাল সিটির সাবেক মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ৫ আগস্টের পর দেশত্যাগ করেন।
তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের দাবি, যাদের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা এত দিন দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতেন, সংকটের সময় সেই নেতারাই তাদের বিপদের মুখে রেখে বিদেশে চলে গেছেন। এতে তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সাবেক মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বরিশাল সিটির সাবেক প্যানেল মেয়র এনামুল হক বাহার বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে বরিশালে আওয়ামী লীগের রাজনীতি অনেকটা পারিবারিক প্রভাবের মধ্যেই পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘অনেকেই কারাগারে ছিলেন, কেউ আত্মগোপনে ছিলেন। তাই সবাইকে আবার একত্র করার চেষ্টা করছি। আমরা এখন তৃণমূলকে নিয়ে সংগঠনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চাই।’
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আরিফুর রহমান অপু বলেন, ‘পরিবারতন্ত্র বরিশালের আওয়ামী লীগকে দুর্বল করেছে। আমরা তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে রাজনীতি করতে চাই। দলকে নতুন করে সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে।’
জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তারেক বিন ইসলাম বলেন, ‘মহানগর আওয়ামী লীগ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। তাই নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে সংগঠন পুনর্গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে।’
অন্যদিকে রমজান মাসের শুরু থেকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ইফতারসামগ্রী বিতরণ, পোস্টার লাগানোসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের একটি অংশ। এর নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক কাউন্সিলর রাজীব হোসেন খানের অনুসারীরা। ৭ মার্চ উপলক্ষে নগরের বধ্যভূমিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
পলাতক থাকা রাজীব হোসেন খান মোবাইলফোনে বলেন, ‘দল এখন ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। সেখান থেকেই আমরা সংগঠনকে শক্ত করার চেষ্টা করছি। ক্ষমতায় না থাকলেও সাধারণ মানুষের পাশে থাকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
এদিকে শনিবার নগরীর মুসলিম গোরস্তানে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে অর্ধশত নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতাদের কবর জিয়ারত করেন। ৫ আগস্টের পর এটিই তার প্রথম প্রকাশ্য উপস্থিতি বলে জানা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতারাও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মীর জাহিদুল কবির জাহিদ বলেন, ‘মামলার আসামিরা প্রশাসনের নীরবতায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে। প্রশাসনের উচিত বিষয়টি নজরদারিতে আনা।’
মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যদি সুস্থ ধারার রাজনীতি করতে চায়, সেটি ইতিবাচক। তবে দলটির কার্যক্রম যেহেতু নিষিদ্ধ, তারা রাজনীতি করতে পারবে কি না, সে সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের।’
মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক বলেন, ‘যারা সহিংসতার মামলার আসামি, তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। আওয়ামী লীগের কোনো অংশ রাজনীতিতে ফিরতে চাইলে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।’