ফেনীতে লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই যত্রতত্র গড়ে উঠেছে করাতকল। বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না। ফলে একদিকে উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল, অন্যদিকে বাড়ছে পরিবেশ ও জলবায়ু দূষণ।
জেলা বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফেনী সদর উপজেলায় মোট ৯২টি করাতকলের মধ্যে বৈধ ৫৮টি। সোনাগাজীতে ৪৬টির মধ্যে বৈধ ৩৩টি। ছাগলনাইয়ায় ৪৬টির মধ্যে বৈধ ১৬টি, পরশুরামে ২০টির মধ্যে বৈধ ৪টি এবং ফুলগাজীতে ২৩টির মধ্যে বৈধ রয়েছে মাত্র ২টি করাতকল। এছাড়া দাগনভূঞা উপজেলায় ৩৩টি করাতকলের মধ্যে ২৫টি বৈধ।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, গত এক বছরে ৪টি করাতকলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। এছাড়া ২টি অবৈধ করাতকল উচ্ছেদ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।
জানা গেছে, জেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আশেপাশে গড়ে ওঠা করাতকলগুলোতে নিয়মিত কাঠ চেরাই করা হচ্ছে। এতে দ্রুত কমছে বনভূমি। পাশাপাশি আবাসিক এলাকাতেও করাতকল স্থাপন করা হয়েছে। শ্যালো মেশিন ও জেনারেটর মেশিনের তীব্র শব্দে ভোগান্তিতে পড়েছে জনজীবন। করাতকলের বর্জ্য ও ধুলাবালিতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
ফেনী শহরের বাসিন্দা সাফায়েত হোসেন মুরাদ জানান, ‘আবাসিক এলাকাগুলোতে অনেক করাতকল রয়েছে। অধিকাংশ করাতকলের কোনো কাগজপত্র নেই। প্রশাসনের নাকের ডগায় এগুলো চালানো হচ্ছে। এতে সব বয়সী মানুষের রোগ বাড়ছে, পরিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।’
ফেনী ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একটি করাতকল রয়েছে। তীব্র শব্দ হয়। কাঠের গুড়া চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবাই দূষণের কবলে পড়ছে। আমরা চাই এসব করাতকল আবাসিক এলাকা থেকে সরানো হোক।
চেরাই করার জন্য আনা গাছ সড়কের পাশে ফেলে রাখায় দুর্ঘটনাও বাড়ছে। মোস্তাফিজুর রহমান মুরাদ নামে একজন বলেন, ‘শহরের পুলিশ লাইন থেকে দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত সড়কের দু পাশে প্রায় ৭টি করাতকল রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মালিকরা গাছের টুকরোগুলো সড়কের জায়গা দখল করে রাখছে। এতে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু দেখার কেউ নেই।’
স্থানীয়দের দাবি, জেলার ২৬০টি করাতকলের মধ্যে অধিকাংশের বৈধ কাগজপত্র নেই। প্রশাসন ও বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ‘মাসোহারা’ নিয়ে এসব করাতকল চালাতে সহায়তা করছেন।
তবে করাতকল মালিকদের দাবি ভিন্ন। ফুলগাজী উপজেলা করাতকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের বলেন, ‘ফুলগাজী উপজেলায় প্রায় ২৬ থেকে ২৭টি করাতকল রয়েছে। অধিকাংশরই কাগজপত্র ঠিক। এসব করাতকল সমিতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই সমিতি গঠনের জন্য বনবিভাগের জিয়াউদ্দিন নামে এক কর্মকর্তা আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী কমিটি পরিচালিত হচ্ছে।’
ফেনী পুলিশ লাইন এলাকার খায়ের টিম্বারের মালিক আবুল খায়ের জানান, ‘কাগজপত্র না থাকায় আগে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। পরে মামলা শেষ করে কাগজপত্র নবায়ন করা হয়েছে।’ রাজিব স মিলের মালিক রাজিব হোসেন বলেন, ‘সীমান্তবর্তী পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকলের লাইসেন্স দেওয়া হয় না। তাই কাগজপত্র ছাড়া করাতকল চালাতে হচ্ছে।’
পরিবেশ ক্লাব অব ইয়ুথ নেটওয়ার্কের সভাপতি নজরুল বিন মাহমুদুল বলেন, অবৈধ করাতকলের কারণে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। এতে জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়ছে। বহু প্রজাতির বৃক্ষ, লতা-গুল্ম ও বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বন কমে যাওয়ায় পানির উৎস কমছে। শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে পানি সংকট।
ফেনী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) মোসাব্বের হোসেন আহাম্মদ রাজিব বলেন, ‘অবৈধ করাতকল নিয়মিত পরিদর্শন করা হচ্ছে। এ সময় পরিবেশ ছাড়পত্র নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ না মানলে জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়। এছাড়া শব্দ ও বায়ুদূষণের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
ফেনী সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, করাতকল সংক্রান্ত ১১টি রিট মামলা চলমান রয়েছে। এসব মামলায় সংশ্লিষ্টরা আদালত থেকে স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) নিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। এছাড়া লাইসেন্সবিহীন করাতকলের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। অভিযানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, জরিমানা, উচ্ছেদ ও মামলার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে শিগগিরই যৌথ অভিযান চালানো হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হলে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে। নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষ করে অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।